দৈনিক সমাচার, ডিজিটাল ডেস্ক : দুর্নীতির নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করছে তৃণমূল। ভুয়ো মাস্টাররোল দেখিয়ে টাকা তোলা, জব কার্ড হাতিয়ে নেওয়া, প্রকল্প না হলেও কাগজে কলমে তা দেখিয়ে টাকা তোলা, ইন্দিরা আবাসনের প্রকল্প থেকেও কাটমানি খাওয়া – এসব রাজ্যের প্রতিটা জেলায় স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। সঙ্গে আছে তোলা আদায়। কিন্তু আমফানের ক্ষতিপূরণ নিয়ে হুগলিতে দেখা গেল দুর্নীতির কৌশল নিয়েও শাসক তৃণমূল যেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। নতুন নতুন পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছে।
আমফানের ঝড়ে ক্ষতি হয়েছে হুগলীর কিছু এলাকা। তার মধ্যে অন্যতম চণ্ডীতলা ২ নম্বর ব্লকের গরলগাছা গ্ৰাম। আমফানের পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা এখানে তৈরি হওয়ার পরেই শুরু হয় হইচই। শাসক দলের ঘনিষ্ঠজনদের নাম ঢোকানো হয়েছে তালিকায়। তাতে পঞ্চায়েত প্রধানের স্ত্রী থেকে আত্মীয়, ঘনিষ্ঠদের নামই রয়েছে। যাদের সকলেরই রয়েছে পাকা বাড়ি, কারো কারো দোতলা পেল্লাই বাড়ি। জানালার একটা কাচও ভাঙেনি অথচ ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় তাঁদের নাম জ্বলজ্বল করছে। টাকা লুটের এটা চেনা কৌশলই।
নতুনত্ব কী? ক্ষতিগ্রস্তদের সেই তালিকায় চোখ বোলালেই দেখা যাচ্ছে ‛ক্ষতিগ্রস্ত’ ব্যক্তির নাম, ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট নম্বর, আইএফসি কোড নম্বর দেওয়া রয়েছে। সবার শেষ কলমে রয়েছে মোবাইল নম্বর। কিন্তু কী আশ্চর্য, তালিকায় থাকা ক্ষতিগ্রস্তদের সবার মোবাইল নম্বর একই। শেষ চার সংখ্যাও এখানে উল্লেখ্য করে দেওয়া হচ্ছে ৫৭০৯। ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট নম্বর আলাদা, ঠিকানা আলাদা, আইএফএসসি নম্বর আলাদা, শুধু প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্তর মোবাইল নম্বর একই।
ঐ মোবাইল নম্বর তাহলে কার? কেন লিস্টে শুধু এই নম্বরটি দেওয়া হয়েছে? ঐ মোবাইল নম্বরটির মালিক মনোজ সিং। মনোজ সিং গরলগাছা গ্ৰাম পঞ্চায়েত প্রধান। এলাকার তৃণমূল নেতা। সবার নামের পাশেই পঞ্চায়েত প্রধানের নম্বর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আমফানে ক্ষতিপূরণ হিসাবে যারই অ্যাকাউন্টে সরকারের তরফে কুড়ি হাজার টাকা ঢুকবে সেই মেসেজ অ্যালার্ট যাবে তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানের মোবাইলে। এই এই তালিকা কীভাবে অনুমোদিত হতে পারে, উত্তর নেই প্রশাসনের কাছেও।
এই গরলগাছা পঞ্চায়েতে ৯৪ জনের নাম ক্ষতিগ্রস্তর তালিকায় ঠাঁই পেয়েছিল। তার মধ্যে ৮০ শতাংশ প্রধানের ঘনিষ্ঠজনদের নাম। গরলগাছা পঞ্চায়েতে মূলত ক্ষতি হয়েছে কৃষ্ণপুর ও একলাখি গ্ৰামে। যদিও তালিকায় বেশিরভাগ নাম রয়েছে পঞ্চায়েতে প্রধান গরলগাছার। তালিকায় আছে প্রধানের স্ত্রী মিনতি সিংহ। দোতলা পেল্লাই বাড়ি। রয়েছে পঞ্চায়েতের তৃণমূলী সদস্য বিপাশা মণ্ডলের স্বামী কানটু মণ্ডল। প্রধানের ছায়াসঙ্গী অতনু চ্যাটার্জির বা শ্যামাচরণ চ্যাটার্জি। করোও বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়নি, অথচ সরকার অনুমোদিত আমফান ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় ঢুকে গেছে নাম । এখনও ক্ষতিপূরণের টাকা ব্লকে আসেনি, তার আগেই চলে এসেছে দুর্নীতির এই নতুন চেহারা।
পঞ্চায়েত প্রধানের স্ত্রীর নামও ক্ষতিগ্ৰস্তদের তালিকায়, তা সামনে আসার পরেই গ্ৰামে বিক্ষোভের পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযোগ জানায় সিপিআই (এম)। স্থানীয় পার্টি নেতা বাবুলাল মান্নার কথায়, ‛তৃণমূল দুর্নীতিতে পেশাদারদেরও হার মানবে। কতরকমভাবে দুর্নীতি করা যায় তৃণমূল না আসলে মানুষ জানতে পারত না। আমরা বিডিও অফিসেও ডেপুটেশন দেব। মানুষজন ক্ষুব্ধ। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বঞ্চিত।’
করোনার জেরে লকডাউন পর্বে গোটা রাজ্যেই রেশনের চাল চুরির অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। সুন্দরবনের একাধিক জায়গায় সরকারের তরফে আমফানের ক্ষতিগ্ৰদের কুড়ি হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষণার পরে তালিকায় নাম তোলার জন্য হাজার পাঁচেক টাকা নেওয়া হচ্ছে এমন ঘটনাও ঘটছে। এমনকি একাধিক জায়গায় ত্রিপল নিয়ে দুর্নীতি,
ত্রিপল দেওয়া হচ্ছে না ক্ষতিগ্ৰস্ত মানুষদের। সেই ত্রিপল বেচে দেওয়া হচ্ছে বাইরে। তবে সব ছাপিয়ে নতুনভাবে সামনে এসেছে সব ক্ষতিগ্রস্তদের একই মোবাইল দেওয়ার ঘটনা।
আয়লার পরে টাকা বরাদ্দ হলেও নদী বাঁধ মেরামতের কাজে এক কোদাল মাটি পড়েনি গত ন’ বছরে, তার মাশুল গুনছে সন্দেশখালি থেকে হিঙ্গলগঞ্জ , হাসনাবাদ থেকে পাথরপ্রতিমা। তার মধ্যেই বিপর্যয়েও দেদার টাকার লুটের তৃণমূলী অভিযান অব্যাহত।
চণ্ডীতলার ঘটনায় গ্ৰামের মানুষের বিক্ষোভ ও সংবাদমাধ্যমে সামনে আসায় অস্বস্তিতে পড়া তৃণমূলের পক্ষে জানানো হয়েছে অভিযুক্ত পঞ্চায়েত প্রধানকে ইস্তাফা দেওয়ায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকা থেকে তার স্ত্রীর নামও প্রত্যাহার করা হবে বলেও জানানো হয়েছে শাসক দলের তরফে , যদিও তাতে গ্ৰামবাসীর ক্ষোভ কমেনি, অভিযুক্ত পঞ্চায়েত প্রধানকে ওই নম্বরে বারেবারে ফোন করা হলেও পাওয়া যায়নি, ব্লক প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে ঘটনার খবর শোনা গেছে। খতিয়ে দেখা হচ্ছে , তালিকা সংশোধন করা হবে।




















