Tuesday, March 3, 2026
Latest Newsফিচার নিউজরাজ্য

বোমার আতঙ্ক কাটিয়ে স্কুলছুটদের নিয়ে বাজিমাত নূর জাহানারা হাইমাদ্রাসার

নিজস্ব সংবাদদাতা, দৈনিক সমাচার, জঙ্গিপুর : মুর্শিদাবাদের ফরাক্কার বটতলা। মাত্র কয়েক বছর আগে এলাকাবাসীদের ঘুম ভাঙত গুলি বোমার আওয়াজে। একসময় গঙ্গা ভাঙন কবলিত এই এলাকায় সমাজবিরোধীদের ছিল রমরমা দাপট। সেই হতাশাজনক পরিবেশে স্কুলছুট শিশু শ্রমিকদের নিয়ে শিক্ষার আলো জ্বালাতে এগিয়ে এল নূর জাহানারা স্মৃতি হাই মাদ্রাসা।

শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় সুদিন ফিরেছে এলাকায়। এ বছর এই মাদ্রাসার ২৬ জন ছেলে ও ২৬ জন মেয়ে মিলে মোট ৫২ জন পড়ুয়া হাই মাদ্রাসার মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে। তার মধ্যে ১জন ছেলে ও ১ জন মেয়ে বাদে বাকি ৫০ জন পাস করে বাজিমাত করল। উত্তীর্ণ ৫০ জনের মধ্যে পাঁচ জন প্রথম বিভাগে। ছেলেদের মধ্যে আব্দুস সামাদ ৫৭৬ ও মেয়েদের মধ্যে মাফরুজ খাতুন ৫৬৬ সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে।

মাদ্রাসার ছাত্রী মাফরুজ খাতুন আনন্দে একগাল হাসি মুখে জানায়, অনেকেই বলেছিল বটতলায় বোমা বাজি হয় ওখানে গেলে পড়াশোনা হবে না। আমাদের স্যারেরা হাতে ধরে শেখাতেন। তাই ফাস্ট ডিভিশন পেয়ে পাশ করেছি। তবে আর একটু পরিশ্রম করলে স্টার পেতাম। অন্যান্য পড়ুয়াদের মুখেও একই কথা, আমরা বিড়ি বাঁধতাম, হকারীর কাজ করতাম। স্যারের কথা মত পড়ে পাশ করেছি। আরো পড়তে চাই। মাদ্রাসাটি উচ্চমাধ্যমিক হলে সুবিধা হত বলে জানাচ্ছে পড়ুয়ারা।

৫০ জনের মধ্যে সীমা নামে একজন প্রতিবন্ধী (মুক ও বধির) মেয়ে ছিল সেও পাশ করেছে। গোলাপ নামে বাবা হারা এক শিশু শ্রমিক কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে জানাল তার অভিজ্ঞতা, আমি এই মাদ্রাসায় রাজমিস্ত্রীদের সাথে কাজ করতাম। কখনো কোন স্কুলে পড়িনি। হেডস্যার আমাকে বিনা ফিজে ক্লাস নাইনে ভর্তি করে নিল এবং শিক্ষকেরা হাতে ধরে শেখাতেন বলেই আজ আমি মাধ্যমিক পাশ।

২০১৪ সালে মাদ্রাসাটি ফারাক্কার প্রত্যন্ত পিছিয়ে পড়া মহেশপুর অঞ্চলে ১৩জন পড়ুয়া নিয়ে পথ চলা শুরু করে। ২০১৭ সালে প্রথম নবম শ্রেণির ক্লাস শুরু হয়। ২০১৯ এ প্রথম মাধ্যমিক দেয় ১৩ জন পরীক্ষার্থী। সেবছর একজন ছাড়া বারো জনই পাশ করে। এ বছরও ৫২ তে ৫০ জন পাশ করায় এলাকায় বইছে খুশির হওয়া।

ইংরেজি শিক্ষক মহ: পারভেজ বলেন, আয়েশা ও সিটু একেবারে স্কুল আসত না। পাশ করতে পারবে না জেনেও প্রধান শিক্ষক ওদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে বুঝিয়ে পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপ করায়। ওরা একটু পড়লেই পাশ করে যেত।

মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক জানে আলম সকল কৃতী ছাত্রছাত্রীদেরও হার্দিক শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিনন্দন জানায়। একই সঙ্গে সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও প্রাণঢালা মুবারকবাদ জানিয়ে বলেন, শিশুর দল পড়াশোনা ছেড়ে শিশু শ্রমিক, হকারি, বিড়ি বাঁধা ছাড়াও লটারী জুয়া ও ডেনড্রাইড এর নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে। তাদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে মাদ্রাসায় ভর্তি করাই। এই বঞ্চিত ছেলে মেয়েরা যে এত ভালো ফল করবে ভাবতেই পারিনি। ওদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।

 

আরও খবরাখবর পেতে যোগ দিন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রূপে

Leave a Reply

error: Content is protected !!