Friday, March 6, 2026
সম্পাদক সমীপেষুসম্পাদকীয়

‛ওঁরা’ই দেশের ভীত, ‛ওঁরা’ই আজ রক্তাক্ত!

আফরিদা খাতুন আঁখি : পঞ্জাব-মুম্বই-গুজরাতে।

গুরুগুরু গর্জন গুন্‌গুন্‌ স্বর
দিনরাত্রে গাঁথা পড়ি দিনযাত্রা করিছে মুখর।
দুঃখ সুখ দিবসরজনী
মন্দ্রিত করিয়া তোলে জীবনের মহামন্ত্রধ্বনি।
শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ-‘পরে
ওরা কাজ করে।
– রবি ঠাকুর

রবি ঠাকুরের অন্তিম লগ্নে যখন তাঁর লেখনী অচল হয়ে গিয়েছিল, যখন স্তিমিত হয়ে এসেছিল তাঁর কণ্ঠ তখন অস্ফুট স্বরে বলে গিয়েছিলেন ‛ওঁদের’ কথা। কিন্তু কবি গুরুর জন্ম লগ্নে যখন ঔরাঙ্গাবাদে ‛ওঁদের’ পনেরোটার অধিক তরতাজা প্রাণের বলি ঘটলো, ‛ওঁদের’ পোড়া রুটিগুলো যখন তাজা রক্তে ভিজে গেল, ‛ওঁদের’ সন্তানদের স্বপ্নগুলো থেকে যখন টাটকা রক্ত ক্ষরিত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো, তখন কবির মতো ‛ওঁদের’ কথা ভেবে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ভাষায় খুব কম মানুষই মসনদে বসে থাকা রক্ত পিপাসু শাসকদের মুখের উপর বলেছে ‛রাজা তোর কাপড় কোথায়?’

আমরা সবাই ২৫শে বৈশাখে কবির গান ‛আমার পরাণ ও যাহা চাই’তে মত্ত ছিলাম। ‛ওঁদের’ কঠোর পরিশ্রমেই একটা ভূখণ্ড দেশ হয়ে ওঠে, ‛ওঁরা’ই একটা দেশ তথা জাতির প্রকৃত সম্পদ। ‛ওঁরা’ কোন ভাবে যদি অচল হয়ে পড়ে সমগ্র বিশ্ব থমকে যাবে। কিন্তু যাঁরা একটি সম্পূর্ণ জাতি তথা দেশের ভীত, তাঁরাই যুগের যাঁতাকলে বরাবর পিষতে থাকে। এমনকী মহামারী এই স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতেও তাঁরা কেবল অবহেলিত হচ্ছে তা না বরং তাঁদের খালি পেটে ঠেলে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুর লেলিহান শিখাতে এবং তা ঘটছে খোদ স্বদেশের মাটিতে।

‛করোনা’ আর ‛অনাহার’ যেন একে অপরের সাথে প্রতিযোগীতাতে নেমেছে। এই মোদী জমানায় যেন মোক্ষম সুযোগ তাদের এই প্রতিযোগীতার জন্য কারণ এই দুইটি বিষয়েই মোদী ও তাঁর সাগরেদরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছে। একদিকে করোনা মৃত্যুবাণ হয়ে ধেয়ে আসছে আর অন্য দিকে অনাহার, কঙ্কালসার দেহ গুলো থেকে টেনে হিঁচড়ে বার করে আনছে শেষ প্রাণ বায়ুটা। একদিকে অতিমারি করোনার দাপট দেখে মনে হচ্ছে দেশটা কী তাহলে স্পেনের মত মৃত্যু পুরীতি পরিণতি হতে চলেছে অতঃপর পথের ধারে ক্ষুধার্ত পরিযায়ী শ্রমিক দের দেখে মনে হচ্ছে দেশটা বুঝি ইয়েমেনের মত বিকৃত কঙ্কালসার লাশের ভাগাড় হতে চলেছে। বিংশ শতকের ভারতীয়রা সৌভাগ্যের ভাণ্ডার নিয়ে ভারত নামক এই ধরাতে জন্মলাভ করেছে। কারণ তাদের কপালে যেমন জুটেছে রক্তচোষী হেঁড়ে মাথা শাসক দল, তেমন অতিমারি, সঙ্গে অনাহারটাও বাদ যায়নি।

আমরা ভাগ্য গুণে এমন এক শাসক গোষ্ঠীর সুনজরে পড়েছি, যারা এই অনাহর ক্লিষ্ট ক্ষুধার আগুনে জ্বলতে থাকা তপ্ত ভূমিতে দাঁড়িয়েও আকাশ পথে উড়ান দেওয়ার জন্য আট কোটিরও বেশি টাকা ব্যায় করার ধৃষ্টতা দেখায়। কোটি কোটি টাকা খরচ করে এমএলএ কেনার মধ্যেই দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখতে পায়। করোনা প্রতিকারের নামে নিম্নমানের টেস্ট কীটস্ এর যোগান দিয়ে আমাদের দলপতি তালি থালি আর মোমবাতি জ্বালিয়ে দেশকে মৃত্যুর দিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। ডাক্তার, নার্সদের পিপিই না দিয়ে মাথার উপর খাঁড়া ঝুলিয়ে আকাশ থেকে পুষ্প বর্ষণ করে তাদের প্রতি ঠুনকো সম্মান প্রদর্শন করে।

আর পরিযায়ী শ্রমিকরা তো আমাদের নেতা মন্ত্রীদের কাছে মানুষ হিসেবে গণ্যই হয় না। এই সমস্ত শ্রমিকদের লকডাউনের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে না আছে মাথা গোঁজার জায়গা না আছে ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাদ্য। তাঁরা যখন এক মুঠো ভাতের দাবি জানিয়েছিল তখন তাদের পেট পুরে খাবার বদলে মিলেছিল নির্মম প্রহর। বালবাচ্চা নিয়ে তপ্ত রাজপথের উপর দিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের দীর্ঘ লাইনের মর্মান্তিক চিত্র দেখে সমগ্র বিশ্ব দাপিয়ে বেড়ানো করনোর মত ভয়ঙ্কর ভাইরাসেরও ভিমরী খাওয়ার উপক্রম। তাঁদের আর্তনাদ, তালি থালির আওয়াজে বধির সরকার আর তার সাগরেদদের কানে না পৌঁছানোর কারনে শতশত শ্রমিক বেছে নিচ্ছে তাদের নিজেদের পথ। রাজপথে কখনো তাদের করা হচ্ছে উত্তম প্রহর, আবার কখনো ৮৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ সাইকেলে পাড়ি দিতে গিয়ে স্ত্রী, সন্তান সহ বলি হতে হচ্ছে সড়ক দূর্ঘটনাতে। সড়কের প্রহর থেকে রক্ষা পেতে রেললাইন ধরে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত অবশ দেহ গুলি পিষে যাচ্ছে মালগাড়ির চাকাতে, রক্ত স্নাত হচ্ছে তাদের আধ পোড়া রুটি গুলো।

এই দেশে এমএলএ কন্যার ঘরে ফেরার জন্য উড়োজাহাজ ঠিকই মেলে, কিন্তু আটকে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার জন্য সরকারের দেওয়া ভরসা বাণী গুলো কেবল নেতা মন্ত্রীদের ফাঁকা বুলিতেই আটকে আছে, বাস্তবে এই সমস্ত আশা বাণী গুলো যেন লুকোচুরি খেলে চলেছে প্রতি নিয়ত। যে দেশে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মাতালদের মদ কেনার জন্য পুলিশ পাহারা দেয়, আর বাধ্য হয়ে ঘর ফেরত পরিযায়ী শ্রমিকদের সাহায্য করার পরিবর্তে পুলিশ রা নির্মমভাবে প্রহার করে। ভিন রাজ্যে আটকে যাওয়া শ্রমিকদের ঘরে ফেরা গাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করতে আমাদের সরকার অক্ষম হলেও তাদের লাশ বহন করার ব্যাপারে সরকার ঠিকই সক্ষম। দেশটা যে ধীরে ধীরে মানুষ বাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে তা ভাবতে হয় বৈকি।

যেখানে প্রতিটি দেশের সরকার এই কঠিন পরিস্থিতিতে দেশবাসীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশকে সারিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে সেখানে আমাদের সরকার কেবল ‛মিত্রোঁ’ বলেই খান্ত যা চরম ঘৃণ্যকর। এখনও যারা এই দায়িত্ব জ্ঞানহীন, নিষ্ঠুর পাষণ্ড সরকার নিয়ে গর্ব বোধ করে অথবা আইটি সেলের বানানো পোস্টার দিয়ে তাদের সরকারকে ধোয়া তুলসী পাতা প্রমাণ করার জন্য সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ঝড় ওড়ায়, তারা হয় ঘাড়ের উপর মস্তিষ্কের বদলে আস্ত কানা তাল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, না হয় নিজের বিবেক বুদ্ধিকে ক্রিস্টফার মার্লোর ডঃ ফস্টাসের মতো শয়তানের ন্যায় এই পাষণ্ড সরকারের কাছে বাঁধা দিয়ে এসেছে। মোদী-শাহরা দিল্লির পার্লামেন্টে না বরং থালা ঘণ্টা নিয়ে সার্কাসেই বেশি মানানসই, আর তাদের হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সটির আইটি সেলের বই পাঠ করা ভক্ত ছাত্রদের ঐ সার্কাসের দর্শক হাওয়াই বেশি যুতসই হবে। তাতে করে অন্তত মোদী-শাহ এবং ভক্তরা মনের সুখে তালি বাজাতে পারবে।

লেখিকা : রিসার্চার, সোসিও ইডুকেশনাল রিসার্চ সেন্টার (সার্ক)

Leave a Reply

error: Content is protected !!