Wednesday, March 4, 2026
Latest Newsফিচার নিউজরাজ্য

মুর্শিদাবাদের গর্ব নিমতিতার ঐতিহাসিক রাজবাড়ির পুজো ও জানা-অজানা কিছু তথ্য

মিজানুর রহমান, দৈনিক সমাচার, মুর্শিদাবাদ:  মুর্শিদাবাদের গর্ব নিমতিতার ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি। যেখানে তারাশঙ্কর বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় বিরচিত ও সত‍্যজিৎ রায় পরিচালনায় বিখ্যাত ‘জলসাঘর’ অভিনীত হয়। রাজবাড়িটা মুর্শিদাবাদ জেলার সামসেরগঞ্জ ব্লকের অধিনে নিমতিতা গ্ৰামপঞ্চায়েতের গঙ্গানদীর কিনারায় অবস্থিত। প্রায় ৩৫০ বছর আগে, জমিদার গৌড়সুন্দর চৌধুরী ও দ্বারকানাথ চৌধুরীর হাতে তৈরি হয়েছিল এই রাজবাড়ি। রাজপ্রাসাদের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাজকীয় বৈভব ছিল তখন। বর্তমানে এর অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিষ্ঠুর কাল কেড়ে নিয়েছে তার যৌবন। জরাজীর্ণ কঙ্কালসার অবস্থায় নিমতিতার রাজবাড়ি কোনওক্রমে দাঁড়িয়ে রয়েছে জানা-অজানা ইতিহাসের নানা সাক্ষী নিয়ে। বিবর্ণ দেওয়াল ও দাঁত বের করা ইটগুলোই আজ সার।

এক সময় নাটকের আঁতুড় ঘর ছিল এই নিমতিতা রাজবাড়ি। তবে পুরনো এই ঐতিহাসিক বাড়িটি বরাবরই নাট‍্যচর্চার অন‍্যতম স্থান হিসেবে বিখ্যাত। এখানে এক সময় বহু নাটক অভিনীত হয়েছে। ক্ষিরোদা প্রসাদ, বিদ্যা বিনোদ, শিশির কুমার ভাদুরির নাটক মঞ্চস্থ হত এখানে। এখানেই এক সময় শুটিং হয়েছে ‘জলসাঘর’, ‘দেবী’-র মতো ছবির। পালাগান, ঝুমুর, যাত্রা, মেলা এই সব ছিল রাজবাড়ির পুজোর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

এই বাড়িতে মহেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী ১৮৯৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নিমতিতা হিন্দু থিয়েটার নামক নাট্য সংস্থা। নাট্যচর্চায় তিনি নিজেও বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরকেও উৎসাহ দিতেন। প্রথমে এলাকার যুবসম্প্রদায়কে নিয়ে নাটক মঞ্চস্ত করতে শুরু করেন। এর পর ১৯০২ সালে নিমতিতার জমিদার বাড়ীতে কলকাতার পেশাদারী থিয়েটার দল আসেন জমিদার পুত্র জ্ঞানেন্দ্র নারায়নের বিবাহ উপলক্ষ্যে এবং অভিনয় করেন। নাটকগুলি: ‘চৈতন্যলীলা ‘ ‘ চন্দ্রশেখর ‘ ‘সাবিত্রী ‘।

মহেন্দ্র বাবুর বিশেষ অনুরোধে নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ী তার ভারতী নাট্যদল নিয়ে এসে ‘আলমগীর ‘ ও ‘চন্দ্রগুপ্ত ‘ অভিনয় করেন। নাট্যকার ক্ষীরোদ প্রসাদ বিদ্যাবিনোদ নিমতিতা জমিদার বাড়ীতে বসেই তার অনেক নাটক রচনা করেন। কলকাতার বহু নাটকগুলি এখানে অভিনীত হতো। যেমন ঃ’ চৈতন্যলীলা’,’ নল ও দময়ন্তী’, ‘শঙ্করাচার্য,’ ‘বিশ্বমঙ্গল,” প্রতাপাদিত্য’, ‘আলিবাবা,’ ‘রামানুজ’, ‘পদ্মিনী’,’ ভীষ্ম’,’ সাজাহান,’ মেবার পতন,’ ‘দুর্গাদাস,’ ‘চাঁদবিবি,’ রঘুবীর,’ বঙ্গে রাঠোর.’..।

ভাঙাচুরা রাজবাড়ির এক পাশে রয়েছে পূজো করার জন্য একটা ঘর। প্রতিবছর এখানে নিয়মমাফিক দুর্গা পূজা করা হয়। বর্তমানে পুরনো জাঁকজমক না থাকলেও পুজো হয় কিন্তু আগের একই নিয়ম নিষ্ঠা মেনে। এই রাজবাড়িতে শুধুমাত্র বছরে একবারই পূজো হয়, আর তা হল দূর্গা পূজো। পূজোতে অংশ নিত গ্রাম ছাড়িয়ে দূরদূরান্তের মানুষও। পুজোর ক’দিন নববধূর সাজে সেজে উঠত এই রাজবাড়ি। পুজো শেষে ছাড়া হত নীলকণ্ঠ পাখিও। কালের নিয়মে আজ সবই ম্লান। যদিও এবছর করোনার জন্য পুজো ততটা জমে উঠেনি।

বর্তমানে গৌর সুন্দর চৌধুরীর চতুর্থ প্রজন্ম এই পুজো সময় সুদূর কলকাতা থেকে নিমতিতা যান। বাপদাদার স্মৃতি মেনেই তারা সেই পুজো উৎসব করে। তবে ইতিহাসের পাতা যেভাবে জীর্ণ হয়ে যায় ঠিক সেভাবেই কালের গর্ভে চলে যেতে বসেছে মুর্শিদাবাদের গৌরব নিমতিতা রাজবাড়ি।

 

Leave a Reply

error: Content is protected !!