দৈনিক সমাচার, ডিজিটাল ডেস্ক : ‛সিসিটিভির ফুটেজ দেখে যেই আমি কয়েকজন হিন্দুর না বললাম, পুলিশ আমাকে বলল মুসলমানদের নাম বল। থানায় আমাকে এবং অন্য মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলা হচ্ছিল, এরাই চাইছিল আজাদি? আমার ধর্মকেই আমার অপরাধ বানিয়ে দিল’। ৫ মাস জেল খাটার পর নিজের অনুভূতি জানালেন ইলিয়াস।
দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক হিংসায় শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণে নিরপরাধ মানুষকে কিভাবে হেনস্থা ও নির্যাতন করা হচ্ছে তার উদাহরণ ইলিয়াস। ২৮ বছরের ইলিয়াসের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযোগ আনে শিব বিহারের রাজধানী পাবলিক স্কুল ভাঙচুর করার। ফেব্রুয়ারির শেষে দিল্লির সাম্প্রদায়িক হিংসার সময়ে ইলিয়াস ওই স্কুল ভাঙচুর করেছে এই অভিযোগে ১৭ মার্চ তাকে ফের গ্ৰেফতার করা হয়। এই মামলায় জামিন পাওয়ার পরেই ১৪ মে শিব বিহারের আরেকটি স্কুল ডিআরপি সেকেন্ডারি স্কুল ভাঙচুরের অভিযোগ এনে তাকে ফের গ্ৰেফতার করা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর জামিন পাওয়ার পর থেকে ইলিয়াস মনে করছে ধর্ম পরিচয়ের জন্যেই তার উপরে এই জুলুম করা হচ্ছে। গোটা পরিবার এখনও আতঙ্কের মধ্যে আছে। শারীরিক, মানসিক নির্যাতন করে দয়ালপুর থানায় সিসিটিভি ফুটেজে হিংসার ছবিতে কোনও একজনকে দেখিয়ে পুলিশ দাবি করে সেটা ইলিয়াস। পুলিশের মিথ্যা দাবি খারিজ করে ইলিয়াস জানান, তিনি কোনো ভাবেই হিংসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তখন তাকে অন্যদের নাম বলতে বলা হয় যারা দাঙ্গায় ছিলেন। ইলিয়াস নাম বলার পরেই মুসলমানদের নাম বলার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
দিল্লি হিংসার সময় রাজধানী পাবলিক স্কুল ভাঙচুর করার অভিযোগে ইলিয়াসকে প্রথম গ্ৰেফতার করা হয়। অন্যান্য কোনও প্রমাণ তো নেই – ই মে ইলিয়াস ভাঙচুরের সাথে যুক্ত ছিল। আরও মজার ঘটনা হল, রাজধানী পাবলিক স্কুলের মালিকানা মুসলিমদেরই। যখন শিব বিহারের মুসলিমদের উপর আক্রমণ করা হচ্ছে, সেই সময়ে মুসলিমদের একটি স্কুলে ভাঙচুরের ঘটনায় একজন মুসলিমকেই গ্ৰেফতার করেছে পুলিশ। যখন এই মামলার জামিন পেয়ে গেছেন ইলিয়াস, তখন অন্য আরেকটি স্কুল ভাঙচুরের ঘটনায় তার নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেটার মালিকানা হিন্দুদের।
আইনজীবীদের মতে, এগুলি অতি কাঁচা কাজ পুলিশের। এইসব ঘটনা থেকে দিল্লির সাম্প্রদায়িক হিংসায় পুলিশের ভূমিকা আরও বেআব্রু হয়ে যাচ্ছে। যে পুলিশ সরাসরি অমিত শাহের হাতে। এমনকি প্রথম মামলায় জামিন পেলেও প্রক্রিয়া শেষে মুক্তির দুই দিন আগে এই নতুন দ্বিতীয় মামলা দিয়ে পুলিশ আটকে রাখে ইলিয়াসকে। অর্থাৎ যে কোনোভাবে পুলিশ ইলিয়াসকে আটকে রাখতে চাইছে।
তবে এখানেই শেষ নয়, এই দ্বিতীয় ঘটনার তথাকথিত সাক্ষীরা চারটি বিবৃতি দিয়েছেন, যেখানে ইলিয়াসের নাম নেই। একজন পঞ্চম সাক্ষী ইলিয়াসের নাম বলেছেন, কিন্তু তিনি দেখেননি ইলিয়াসকে, অন্যের কাছে ইলিয়াসের নাম শুনেছেন মাত্র। এই অভিযোগের মধ্যে ইলিয়াসের আইনজীবী আদিল সৈফুদ্দিন এবং লবকেশ ভামভানি পাঁচ মাসে পাঁচটি জামিনের আবেদন করেছেন।
ভামভানি বলেছেন, ইলিয়াস অনেক গরিব মানুষের মধ্যে একজন যাকে দিল্লি পুলিশ দাঙ্গার ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। গুরুতর প্রশ্ন তুলে তিনি বলেছেন, পুলিশ যেভাবে গণহারে আটক করেছে, তাতে এই গরিব মানুষকে প্রকৃতপক্ষে কার্যকারী আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, সেই বিষয়ে সন্দেহ থাকছে। আইনি সহায়তার অভাবে একজনেরও যদি শাস্তি হয় তাহলে সেটা আইনের শাসনের মূল ভিত্তিতেই আঘাত করা হবে। কার্যত অপরাধের প্রমাণ না থাকলেও ইলিয়াসকে পাঁচ মাস জেলে আটকে রাখা হলো। ইলিয়াসের জামিনের পরেও গভীর আতঙ্কের মধ্যে আছে তাঁর পরিবার।
আত্মীয় মুরাসালিন বলেছেন, দাঙ্গার সময়ে যখন ঘরের ভিতর থেকে ‛জয় শ্রী রাম’ চিৎকার শুনলাম, তাতে কোনও ভক্তি ছিল না। ওটা একটা ঘোষণা ছিল, যেন কোনো যুদ্ধ করতে এসেছে। মুরাসালিন আতঙ্কে আছেন নিজের বড় দাড়ি নিয়ে।
ইলিয়াসের বোন পারভিন জানালেন, যবে থেকে দাদা ঘরে ফিরেছে মা ওর হাত ধরে রেখেছে। ছাড়ছেই না। ওয়েব পোর্টাল ‛দ্য ওয়ার’ জানিয়েছে, ক্রাইম ব্রাঞ্চের এস আই পঙ্কজ কুমার যিনি ইলিয়াসের মামলাটি দেখছেন, এই বিষয়ে কোনও কথা বলতে চাননি। দয়ালপুর থানার এসএইচও তারকেশ্বর সিংয়ের সঙ্গে একাধিক বার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কথা বলতে চাইছেন না।

























