Tuesday, March 3, 2026
Latest Newsফিচার নিউজসম্পাদকীয়

গণপিটুনি, ভুয়ো খবর: আমাদের সমাজের অন্ধকার দিকটা তুলে ধরল “স্টোলেন”

সামাউল্লাহ মল্লিক


সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র “স্টোলেন” শুধুমাত্র একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি আজকের ভারতের এক কঠিন এবং অপ্রিয় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মাত্র ৯৩ মিনিটের এই থ্রিলার মুভিটি সমাজের গভীরে প্রোথিত অন্ধকার দিকগুলো—যেমন গণপিটুনি, ভুয়ো খবর, সহিংসতা এবং সামাজিক বৈষম্য—অত্যন্ত নির্মমভাবে তুলে ধরেছে, যা দর্শক মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

চলচ্চিত্রের মূল কাহিনী একজন ফটোগ্রাফার রমনকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, যাকে একজন আদিবাসী নারী ঝুম্পা তার শিশু চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করে। নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতি দ্রুত ঘোলাটে হয়ে ওঠে, এবং রমন নিজেকে এক উন্মত্ত জনতার হিংস্রতার মুখে দেখতে পায়। এখানেই “স্টোলেন” আমাদের সমাজের এক ভয়াবহ ক্ষতকে উন্মোচন করে – গণপিটুনি বা মব লিঞ্চিং। যখন আইন ও বিচার ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা কমে যায়, অথবা যখন কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের হাতে আইন তুলে নেয়, তখন এমন পাশবিক ঘটনা ঘটে। চলচ্চিত্রটি দেখায় কিভাবে এক মুহূর্তের মধ্যে কোনো ব্যক্তির জীবন নরকে পরিণত হতে পারে, কেবল কিছু ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে।

“স্টোলেন” শুধুমাত্র গণপিটুনিকে তুলে ধরে না, এটি ভুয়ো খবরের বিধ্বংসী ক্ষমতাকেও চিত্রিত করে। একটি ছোট ভিডিও ক্লিপের সামান্য সম্পাদনা, বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি মিথ্যা গুজব কিভাবে সত্যকে বিকৃত করে মার খাওয়া ব্যক্তিকে অপরাধী এবং অপরাধীকে আক্রান্ত বানাতে পারে, তা এই ছবিতে স্পষ্ট। বর্তমান ভারতে ভুয়ো খবরের মাধ্যমে দলিত, মুসলিম বা অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপর আক্রমণের ঘটনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই চলচ্চিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ডিজিটাল যুগে তথ্য যেমন দ্রুত ছড়ায়, তেমনই মিথ্যা তথ্যও দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, যা সমাজে বিভেদ ও হিংসা উস্কে দেয়। তথ্যের যাচাই না করা এবং আবেগপ্রবণ হয়ে প্রতিক্রিয়ার কারণে সমাজে এক ধরনের “বিভ্রান্ত সত্যের” জন্ম হয়েছে, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করে।

“স্টোলেন” আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বৈষম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। এটি দেখায় কিভাবে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা বা উন্মত্ত জনতা যখন দ্রুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে, তখন তারা প্রায়শই আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে যায়। এর ফলস্বরূপ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, কিন্তু প্রায়শই সেই বিচার পথেই “চুরি” হয়ে যায়। চলচ্চিত্রের আদিবাসী নারী ঝুম্পার অসহায়ত্ব এবং রমনের উপর নেমে আসা অবিচার এই কঠিন বাস্তবতারই প্রতিফলন। তাদের লড়াই শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি সমাজের প্রান্তিক মানুষের ন্যায়বিচারের জন্য এক সার্বজনীন আর্তনাদ।

এই চলচ্চিত্রটি ভারতের দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের এক অন্ধকার দিকও তুলে ধরেছে। তীব্র মিডিয়া যোগাযোগ সামাজিক বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা সূক্ষ্ম সত্যকে উপলব্ধি করা কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে, ব্যক্তিরা প্রায়শই নিজস্ব বাস্তবতা তৈরি করে নেয়, যা অপরাধের প্রতি অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে। “স্টোলেন” একটি উদ্ভাবনী থ্রিলার হওয়া সত্ত্বেও, এটি এমন এক বাস্তবতা তুলে ধরে যা একই সাথে আলোচিত এবং অনুল্লেখিত। এটি আমাদের সমাজের প্রতি একটি জরুরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে: আমরা কি এই “অন্ধকার বাস্তবতা” মেনে নেব, নাকি গণপিটুনি, ভুয়ো খবর ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো এবং ন্যায়বিচার ও সমতার জন্য আওয়াজ তুলব?

Leave a Reply

error: Content is protected !!