দৈনিক সমাচার, ডিজিটাল ডেস্ক : রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “ইউরোপের শক্তির ভাণ্ডার স্টেট অর্থাৎ সরকার…, আমাদের দেশে কল্যাণ শক্তি সমাজের মধ্যে”। লকডাউনের দুঃসহ দিনগুলিতে তাঁর কথাকেই সত্য প্রমাণিত করে গরিব মানুষ ও পরিযায়ী শ্রমিকদের বাঁচার লড়াইকে শক্তি জোগালেন সোনু সুদ, স্বরা ভাস্কর, শেফ বিকাশ খান্না, ইরফান ও ইউসুফ পাঠানের মতো সেলিব্রিটিরা।
এই রাজ্যের সেলিব্রিটিদের এমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। দিন পনেরো ধরে নেট দুনিয়ায় প্রশংসিত বলিউড অভিনেতা সোনু সুদের ‛ঘর ভেজো’ অভিযান। সোনু ১০০০-এর মতো আটকে পড়া মানুষকে নিজের পয়সায় ঘরে ফিরিয়েছেন। মুম্বাই থেকে কর্নাটক ও উত্তরপ্রদেশের ৭৫০ শ্রমিককে ২১ টি বাসে বাড়িতে ফিরিয়েছেন। কেরালার এর্ণাকুলামে আটকে থাকা ১৭৭ টি মেয়েকে ২৯ মে বিমানে ভুবনেশ্বর পাঠিয়েছেন। ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের আটকে থাকা শ্রমিকদেরও ঘরে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। সোনু বলেন, ‛শুটিং নেই বলেই পারছি। বাবা ছুটোছুটি করে বাস, ট্রেন বা বিমানের ব্যবস্থা করছে।’

পিছিয়ে নেই স্বরা ভাস্কর। স্বরা ২১ মে থেকে ‛কারবাঁ-এ মহব্বত’ সংগঠনের মাধ্যমে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরাচ্ছেন। গুগলের ফর্ম পূরণ করে দিল্লির আশেপাশে আটকে থাকা পরিযায়ীরা নাম ও নাম্বার দিলে স্বরার বন্ধু ও স্বেচ্ছাসেবীরা বাকিটা করছেন। দিল্লির আম আদমি পার্টির নেতা দিলীপ পাণ্ডে সহ বহু মানুষ তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। স্বরা সম্প্রতি ‛অ্যাকশন শ্যূ’ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েই ৫০০ পরিযায়ী শ্রমিককে পায়ে হাঁটতে যাতে কষ্ট না হয়, তার জন্য বিনামূল্যে জুতোজোড়া দিয়েছেন।

পাঞ্জাবের মোগা জেলার সন্তান নিউ ইয়র্কের ‛মিচেলিন হোটেল চেন’-এর ভারতীয় শেফ বিকাশ খান্না মানবতার অনন্য নজির। ভারতের ৫০টি বড় বড় শহরে বেসরকারি সংস্থা, অনাথ আশ্রম, বৃদ্ধাশ্রম, সামাজিক গোষ্ঠী ও বহু ব্যক্তির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে তিনি অভুক্তদের খাবার খাওয়াচ্ছেন। ‛ফিড ইণ্ডিয়া’ অভিযানে ৫০ টনের চাল, ডাল, আটা, গরিবদের বিলি করার পর তিনি পরিযায়ী পরিযায়ী, পথবাসী, ও অভুক্তদের খিচুড়ি, তরকারি খাওয়ানোর উদ্যোগ নেন। ২৬ মে পর্যন্ত তিনি ভারতের ১২৩টি ছোট বড় শহরের ৭০ লাখ মানুষকে খাবার দিয়েছেন। নয়ডা এবং মুম্বাইতে দুটি রান্নাঘর ছাড়াও চলছে অনেকগুলি মোবাইল রান্নাঘর। খাবার আর্তদের কাছে পৌঁছে দিতে চুক্তি করেছেন ভারত সরকারের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিলিফ ফোর্স-এর সঙ্গে।

বিকাশ এর কৃতিত্ব উৎসর্গ করেছেন নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের শেফ জোস অন্দ্রেজের প্রতি, যিনি প্রতিদিন আড়াই লাখ গরিব আমেরিকানকে খাবার যোগাচ্ছেন। বিকাশের এই ভূমিকার পিছনে আসলে প্রেরণা তাঁর মা। এপ্রিলে বিকাশ জানতে পারেন, বেঙ্গালুরুর এক কুষ্ঠ আশ্রমের গুদামে রাখা চাল ও রান্নার সামগ্ৰী নিয়ে ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি পালানোয় রোগীরা খেতে পাননি। বিকাশ বাড়িতে মাকে ফোনে জানালে মা বলেন, ‛কষ্ট পেতে নেই, মনকে উদার করতে হয়’। এটাই তাকে এই কাজে নামিয়েছে।
ভারতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার দুই ভাই ইরফান ও ইউসুফ পাঠান তাঁদের শহর ভদোদরায় ৪০০০ মাস্ক বিলি করেছেন। পরিযায়ী শ্রমিক ও গরিবদের মধ্যে ৫০০০ কেজি চাল, ৫০০০ কেজি আলু, ৭০০ কেজি টম্যাটো, আর ১০,০০০ কেজি ডাল ও দানাশস্য বিলি করেছেন।

অভিনেত্রী আয়েশা টাকিয়া ও তাঁর স্বামী ফরহান আজমি কোলাবায় তাঁদের গালফ হোটেলটি ছেড়ে দিয়েছেন পুলিশের কোয়ারেন্টিন সেন্টার হিসাবে। অভিনেতা বরুণ ধাওয়ান টাটার তাজ গ্ৰুপের সহযোগিতায় স্বাস্থ্যকর্মী, বেকার ও গৃহহীনদের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। হাসপাতালে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে তাজ পাবলিক সার্ভিস। অভিনেতা রাকুল প্রীতি সিং তাঁর পরিবারের মাধ্যমে গুরগাঁওয়ের ২০০ পরিযায়ী পরিবারকে নিজেদের বাড়িতেই রান্না করা খাবার দিচ্ছেন।

অভিনেতা প্রকাশ রাজ তাঁর ফার্ম হাউসে পুদুচেরি ও চেন্নাইয়ের ১১ টি পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারকে আশ্রয় ও আহারের ব্যবস্থা করেছেন। হৃত্বিক রোশন মুম্বাই পুরসভায় স্বাস্থ্য ও সাফাইকর্মীদের এন-৯৫ ও এফএফপি-৩ মাস্ক যোগান দিচ্ছেন। শাহরুখ খান বিএমসির ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের অফিসটিতে করোনা আক্রান্ত নারী, শিশু, ও বৃদ্ধদের কোয়ারেন্টিন সেন্টার করেছেন। সালমান খান বলিউডের ২৫,০০০ চলচ্চিত্র শিল্পের দৈনিক মজুরির কর্মীকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন। তাঁর পানভেলের ফার্ম হাউস এলাকার গরিবদের খাবার দেওয়ার পাশাপাশি লকডাউনে ক্ষুধার্তদের কাছে খাবার পৌঁছে দিতে বিনা খরচে ‛বিয়িং হাংরি’ নামে ট্রাক সার্ভিস চালু করেছেন।
এরা প্রমাণ করেছেন, সরকার যতই রাষ্ট্রের ধারণাকে পুলিশি রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাক, ভারতের জনতার মূল শক্তি এখনও জনগণের মধ্যেই নিহিত। দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ আজও সত্য। সে তুলনায় অমিতাভ বচ্চনের অবদান বিশেষ কিছু না। সোনু সুদের অবদান দেখে উনি অন্য রাজ্যে আটকে থাকা উত্তরপ্রদেশের কিছু শ্রমিকদের জন্য বাসের ব্যবস্থা করেছেন।
আরও খবরাখবর পেতে যোগ দিন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রূপে




















