দৈনিক সমাচার, ডিজিটাল ডেস্ক : সিএএ, এনআরসি, এনপিআর নিয়ে বিতর্ক হোক বা করোনা সংকটে তবলীগ জামাত ও মৌলানা সাদের ভূমিকা – এই সমস্ত বিষয় নিয়ে শো’ পরিচালনা করা এই সঞ্চালকদের জন্য নিঃসন্দেহে শক্ত কাজ। সবাই জানে যে, এই ধরনের শো’গুলির মূল্য লক্ষ্য হল মুসলিমদের তুলোধনা করা। ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপি হিন্দু ও মুসলিম তাস খেলায় এই ধরনের ইস্যু নিয়ে প্রায় সময় শো’ করতে হয় তাঁদের।
নাগরিকত্ব বিতর্কে আত্মপরিচয়ের সংকট
এই ট্রেণ্ড খেয়াল করা গিয়েছে সিএএ, এনআরসি, এনপিআর বিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই। ওয়াশিংটন পোস্টের কলাম – লেখিকা ও সাংবাদিক রানা আইয়ুব যে চারটি টিভি শো’কে ‛হল অফ শেম’ তালিকায় রেখেছিলেন, তার মধ্যে দু’টিরই সঞ্চালিকা ছিলেন রুবিকা লিয়াকত ও রোমানা ইশার খান। বাকি দু’টির উপস্থাপক ছিলেন ইন্ডিয়া টিভির আমিষ দেবগণ এবং সুদর্শন নিউজের সুরেশ চাভাঁকে। দ্বিতীয়টির আবার ফেক নিউজ ছড়ানোর ‛খ্যাতি’ রয়েছে।
এমন নয় যে, এই সঞ্চালকরা কেবলমাত্র সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে শো’ করেন যেখানে মুসলিমদের কদর্য রূপ তুলে ধরা হয় বা এই সম্প্রদায় সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণাগুলি জাগিয়ে তোলা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার পথে হেঁটে মুখরোচক বিষয় নিয়েও তাঁরা শো’ করেন। হিন্দি নিউজ চ্যানেলের এই মুসলিম সঞ্চালকরা ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেন ক্যামেরার বাইরে। সেটা বেশ মজার। রুবিকা লিয়াকতের ট্যুইটার টাইমলাইন যেন এক আজব ধাঁধা। নিজের শো’ নিয়ে বা বিভিন্ন বিষয়ে ট্যুইট করার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত কুরআনের উদ্ধৃতি পোস্ট করেন। এক ট্যুইটে তিনি লিখেছেন, জিহাদের প্রাথমিক অর্থ হল পূণ্যবান মানুষের অন্তরের সঙ্গে লড়াই এবং জীবনের সব ক্ষেত্রে ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ। কুস্তিগির ববিতা ফোগাট অতিসাম্প্রদায়িক ট্যুইট করে আবার পিছিয়ে এলেও রুবিকা তৎক্ষণাৎ তাঁর পক্ষ নেন। যদিও এই ঘটনায় তাঁকে নিয়ে বিস্তর পরিহাস করা হয়। তবলীগ জামাতকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার জন্য এক মুসলিম ধর্মগুরু এবিপি নিউজ সঞ্চালকদের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। বিজেপির মুখপাত্র তাঁকে মনোনীত করার পর রুবিকা প্রকাশ্যে জানান যে তিনি পিএম কেয়ারে অনুদান দিয়েছেন। একজন ট্যুইট করেছেন, ‛মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তিনি যেভাবে নিজামুদ্দিন ইডিয়টদের তুলোধনা করেছেন, তা প্রশংসার যোগ্য।’ রুবিকা রিট্যুইট করেন এই ট্যুইটকে।
টম চাচা বা গফম্যানীয় কাঠামো?
দেশের মুসলিম সঞ্চালকদের ক্রিয়াকলাপ ও সোশ্যাল মিডিয়াতে তার প্রতিক্রিয়াকে দুভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রথমত, সঞ্চালকদের দৃষ্টিকোণ থেকে, দ্বিতীয়ত, যে নিউজ চ্যানেলের সঙ্গে তাঁরা যুক্ত সেইদিক থেকে। এই সঞ্চালকদের টম চাচা বা অন্য নামে ডাকতে পারেন কেউ। বিজেপির মুসলিম নেতাদের সঙ্গে এঁদের কোনও পার্থক্য নেই। এঁদের নিউজ চ্যানেলের মুখতার আব্বাস নকভি বা শাহনাওয়াজ হুসেন নাম দেওয়া যেতে পারে। তারান্তিনোর ‛জ্যাঙ্গো আনচেইণ্ড’ ছায়াছবির স্যামুয়েল জ্যাকসনের চরিত্রটির কথা মনে আছে? কৃষ্ণকায় হয়েও সে তার শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের চেয়েও বেশি কৃষ্ণবর্ণ – বিদ্বেষী ছিল। ব্যবসার দিক দিয়ে এই মুসলিম সঞ্চালকরা নিউজ চ্যানেলের কাছে বেশি লাভজনক। এর আরও একটি দিক আছে। একজন মুসলিম উপস্থাপক যখন মুসলিমদেরই বিরুদ্ধে কথা বলেন, তখন হিন্দু বায়াস আরও মজবুত হয়। এই জটিল পরিস্থিতিতে এই ধরনের ব্যাখ্যা সরলীকরণ দোষে দুষ্ট। বরং সঞ্চালকদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা যাক।
অনেকের মনে হতে পারে যে, এই সঞ্চালকরা আসলে গফম্যানীয় কাঠামোর মধ্যে বাস করছেন। যে কাঠামোতে এঁরা নিজেদের আলোকপ্রাপ্ত মনে করেন এবং ভিন্ন ধরনের ছাপ রেখে যেতে চান। গড়ে তুলতে চান এক অন্য পরিচিতি। প্রচলিত মতবাদ ও নিউজ চ্যানেলের নিজস্ব নীতি মেনে তাঁরা পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করতে আসরে নেমে পড়েন। এটাও হতে পারে, তাঁরা এমনটা করেন কারণ ভারতীয় দর্শক সাম্প্রদায়িক বিষয়ই দেখতে চান ও তাতেই অভ্যস্ত। তাঁরা কার্যত দর্শকদের চাহিদা পূরণ করেন।
বহু মুখের ফাঁদে
মনে রাখতে হবে, এটাই তাদের জীবনের একমাত্র রূপ নয়। টিভির পর্দায় হাজির হওয়া আসলে মঞ্চে অভিনয় করা মাত্র। তাঁদের জীবনেও ‛ব্যকস্টেজ’ রয়েছে এবং সেখানে তাঁরা হয়ত আলাদা মানুষ। সংখ্যাগুরু অধ্যুষিত ভারতীয় মিডিয়ার তৈরি করে দেওয়া নীতি – নিয়ম মেনে তাঁদের কাজ করতে হয়। তা অমান্য করলে হয় তাঁদের টিভি শো মুখ থুবড়ে পড়বে, নয় তাঁদের অস্তিত্বই লোপ পাবে। পর্দায় তাঁদের যে রূপে দেখি, সেটা তাদের তৈরি করা পরিচিতি। নিউজ চ্যানেলের নির্মাণ করে দেওয়া পরিচিতি। নাট্যরূপময়তার বিশ্বস্ততায় তাঁরা আবদ্ধ। নিউজ চ্যানেলে যোগ দেওয়ার সময় তাঁরা কিছু পেশাগত বিধিনিষেধ মানতে চুক্তিবদ্ধ হন এবং দলের সদস্য হয়ে উঠতে অঙ্গীকার করেন। মুসলিম হওয়ায় তাঁরা আরও আগ্ৰাসী মনোভাব দেখান নিজেদের বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিতে। সংখ্যাগুরু হিন্দুরা যে ধরনের মুসলিমদের ঘৃণা করতে ভালোবাসে, তাঁরা তেমন নন, এটা প্রমাণ করতে তাঁরা মরিয়া হয়ে ওঠেন। সাম্প্রদায়িক বিষয় নিয়ে শো উপস্থাপন করা হিন্দু সঞ্চালকদের কাছে সাধারণ ব্যাপার, কারণ ব্যাকস্টেজে তাঁদের আলাদা অভিনয় করতে হয়না।
মুসলিম সঞ্চালকরা যখন তাঁদের পরিবার বা আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে বাক্যালাপ করেন তখন তাঁদের ওই তৈরি করা পরিচিতি ভেঙে বেরিয়ে আসতে হয়। সোশ্যাল মিডিয়াতেও এঁদের আচরণের তারতম্য ও বৈপরীত্য চোখে পড়ে। যেমন, এবিপি নিউজের রোমানা ইশার খান লাউডস্পিকারে আজান নিষিদ্ধ করার সমর্থনে ট্যুইট করেছেন। এই সঞ্চালকদের জন্য টিভি স্টুডিও একটি মঞ্চ এবং ‛অ্যাজ ইউ লাইক ইট’- এর জ্যাক যেমনটা বলেছিলেন, দুনিয়াটাই একটা মঞ্চ সকল পুরুষ ও মহিলা অভিনয়কারী মাত্র রয়েছে তাদের প্রবেশ ও প্রস্থান; জীবদ্দশায় একজন বহু ভূমিকায় অভিনয় করে। হিন্দি নিউজ চ্যানেলের মুসলিম সঞ্চালকরা বাস করে শেক্সপিয়রীয় দ্বৈততার মধ্যে। হর রোজ। প্রতিদিন।




















