সম্পাদক সমীপেষু

প্রসঙ্গ নিজামুদ্দিন: দেশ দাঁড়িয়ে করোনার মৃত্যু গহ্বরে, সেই জায়গায় দাঁড়িয়েও এতো মুসলিম বিদ্বেষ?

আফরিদা খাতুন আঁখি : একটি জাতি শুরু থেকে নিজের রক্ত, ঘাম দিয়ে একটা ভূখণ্ডকে ‛দেশ’-এ পরিণত করতে সবটুকু উজাড় করে আর সবার মতোই সাহায্য করেছে। আর সবার মতোই দিনান্তের শেষ আলো যখন মিলিয়ে গেছে ঠিক তখন নিকষ অন্ধকারে চোখ রেখে একটা সুন্দর ‛দেশ’-এর স্বপ্ন দেখেছে। দেশ হয়তো চেয়ে ছিল সেই জাতিকে নিজের সন্তানের মতো বেশ আদরে আগলে রাখবে ঠিক যেমনভাবে অন্যদের রেখেছে। কিন্তু ‛দেশ’-এর কিছু সন্তান ‛দেশ’কে না ‛দ্বেষ’কে আপন করেছে, দ্বেষ প্রিয় সেই সন্তানরা বারবার মুসলিম নামক জাতিটার প্রতি বিষ উগরেই চলছে। এমন কী বিষাক্ত সাপের ন্যায় শেষ নিঃশ্বাস ফেলার আগ মূহুর্তে অন্তিম ছোবল ফেলতে উদগ্রীব।

তালি-থালি-লকডাউনের সাহায্য নিয়ে ভারতে মৃত্যুকে দুই ভাবে আহ্বানের পথ করে দেওয়া হয়েছে। যে দেশের স্থান বিশ্ব ক্ষুধাসূচক পরিসংখ্যানের তলানিতে ঠেকতে চলছে সে দেশের জন্য রাতারাতি বিনা পরিকল্পনাতে দীর্ঘ দিনের লকডাউন যে কত ভয়ঙ্কর, তা অনাহার পদযাত্রীদের দীর্ঘ সারিই প্রমাণ। কিন্তু তাদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের জন্য এই মূহুর্তে কঠিন না, কারণ সরকারের কাছে ত্রাণ হিসেবে জমেছে বেশ মোটা অংকের অর্থ তবে এই অর্থ দিয়ে যদি সরকার তার সাগরেদের নিয়ে পেট মোটা করার চিন্তা করে তাহলে উল্টো নির্ণয় যে ঘটতে পারে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। আর সেটাই ঘটে চলেছে। সরকার বাহাদুরই আজ ‛ভাইও আউর বেহনো’ বলতে বলতে দেশটাকে করোনা মহাদেবের পদতলে সমর্পণ করেছে। এবার হয়তো লাশের সংখ্যা গাঁট গোনার আগেই মৃত্যু এসে কড়া নাড়া দেবে।

কিন্তু সরকারের সমস্ত গাফিলতির ঊর্ধ্বে এই মুহুর্তে একটা বিষয়ই আলোচ্য ‛নিজামুদ্দিন’। ১৩ই মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষিত হলো ‛করোনা’ ভারতের জন্য কোন দুশ্চিন্তার কারণ না। এরপরেও ১৩-১৪ই মার্চ তাবলীগের মারকাজ থেকে তাদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ব্যাপারে প্রশাসনকে বারবার অবগত করা হয়। এমনকী তাদের সম্মেলনে বিদেশীদের উপস্থিতির কথা জানানো হয় এবং তারা প্রশাসনের যুক্তি মেনেই বিদেশী দের থাকতে দেয়। অন্য দিকে লকডাউন ঘোষণা করা সত্বেও সংঘী-বিজেপী সহ বিজেপি দলের নেতা মন্ত্রীদের পূজা-পার্বণ-মিছিল এবং সম্মিলিতভাবে চলতে থাকে মূত্র পান, তালি-থালি বাজানো। নিজামুদ্দিন থেকে কয়েকজন আক্রান্ত হতেই দলাল মিডিয়া সহ, নরম গরম হিন্দুত্ববাদী নেতা মন্ত্রী সকলের কাছেই নিজামুদ্দিন এখন ‛টার্গেট করোনা’তে পরিণত হয়েছে।

করোনা থেকে নিজ মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে যেখানে মুসলিম উলেমাগণ ইতিহাসে প্রথমবার জুম্মার নামাজ গৃহে পড়ার নির্দেশ দেন সেখানে কীভাবে বিজেপি সরকার আর তার তালে তাল মেলানো কেজরিওয়াল এবং গোদী মিডিয়া করোনা সংক্রমণের দায় তাবলীগের উপর দিতে পারে? আর যদি ‛নিজামুদ্দিন’ সমাবেশের কারণে সংক্রমণ ঘটেও থাকে তার জন্য প্রশাসনই কী দায়ী না? সমস্ত ব্যাপারে অবগত হওয়া সত্ত্বেও কেন সময় থাকতে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়নি? পরিযায়ী মানুষের দীর্ঘ সারির মাধ্যমে ফুটে ওঠা ভারতের নগ্ন চিত্রকে ঢাকতে এত নীচে কীভাবে নামতে পারে?

সিএএ, এনাআরসি, দিল্লি গণহত্যার টকটকে লাল ক্ষতকে মুছে যে সম্প্রদায় দেশকে এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে দিন রাত এক করে রাস্তায় নেমেছে তাদের গায়ে কীভাবে এমন জঘন্য অপবাদের রঙ লাগাতে পারে? কতটা বিদ্বেষ থাকলে এই মৃত্যু গহ্বরে দাঁড়িয়েও এমন জঘন্য খেলা খেলা যায়? ‛দেশ’-এর পরিবর্তে ‛দ্বেষ’কে আপন করে আর কতদিন চলবে একটা জাতিকে সবদিক থেকে চেপে ধরার এই প্রয়াস? আর কতদিন এই জাতিটাকে নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করার জন্য লড়াই করে যেতে হবে? আর কত বার সব কিছুর বলির পাঁঠা হতে হবে এই জাতিটাকে? এই বিদ্বেষ-এর লড়াইয়ে আসলেই কী তাদের ক্লান্তি আসে না?

লেখিকা : রিসার্চার, সোসিও এডুকেশনল রিসার্চ সেন্টার (সার্ক)

Leave a Reply

error: Content is protected !!