
ভারতবর্ষ বর্তমানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। প্রযুক্তি, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক উন্নয়ন এবং নাগরিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক দ্রুত রূপান্তর আজ দৃশ্যমান। তবে এই পরিবর্তনের ধারাকে সার্থক রূপ দিতে কেবল শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নীতিবান, আত্মবিশ্বাসী, যোগ্য এবং সমাজ-সচেতন এমন কিছু নেতৃত্বের, যাঁরা সমাজের জটিল বিন্যাসকে উপলব্ধি করে ভবিষ্যতের পথনির্দেশ করতে পারবেন।
এই বৃহত্তর লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ‘ভিশন ২০২৬’-এর আওতায় ‘হিউম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ (এইচডব্লিউএফ) শুরু করেছে ‘লিড ১০০’ (LEAD 100 – Leadership Excellence for Advancement and Development)। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ, যার লক্ষ্য সারা দেশ থেকে অসামান্য প্রতিভাবান তরুণ-তরুণীদের খুঁজে বের করে তাঁদের পরিচর্যা করা এবং গুরুত্বপূর্ণ ছ’টি ক্ষেত্রে নেতৃত্বের জন্য তৈরি করা। ক্ষেত্রগুলি হলো—জননীতি (পাবলিক পলিসি), আইন, সামাজিক উদ্যোগ (সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ), কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট, প্রযুক্তি এবং প্রশাসনিক সেবা (সিভিল সার্ভিসেস)।
প্রথাগত বৃত্তি বা সাধারণ শিক্ষাগত সহায়তার চেয়ে ‘লিড ১০০’ মৌলিক অর্থেই স্বতন্ত্র। এর উদ্দেশ্য কেবল কিছু মেধাবী পড়ুয়াকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া বা পড়াশোনা শেষ করতে সাহায্য করাই নয়। বরং আসল লক্ষ্য হলো—অসাধারণ প্রতিভাকে শনাক্ত করে দীর্ঘ সময় ধরে তার লালন করা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে তোলা, সঠিক সুযোগ ও উপযুক্ত পরিমণ্ডল প্রদান করা এবং একদল দূরদর্শী রূপকার ও দেশ গড়ার কাণ্ডারি তৈরি করা।
আমাদের দেশে প্রতিভার অভাব নেই। খামতি যেখানে, তা হলো প্রাথমিক পর্যায়েই সুপ্ত মেধা চিহ্নিত করে বছরের পর বছর ধরে তাকে পরিকল্পিতভাবে বিকশিত করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো। ‘লিড ১০০’ সেই শূন্যস্থানটি পূরণ করতেই সচেষ্ট।
এই প্রকল্পের অধীনে পাঁচ বছরে সারা দেশ থেকে বেছে নেওয়া হবে ১০০ জন অনন্য মেধাবী ছাত্রছাত্রী—প্রতি বছর ২০ জন করে। দশম শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই শুরু হবে এই যাত্রা, যা স্কুলশিক্ষার গণ্ডি ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। মূল উদ্দেশ্য হলো, নির্বাচিত প্রত্যেক পড়ুয়ার সঙ্গে এক দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত বিকাশের প্রতিটি ধাপে নিরবচ্ছিন্ন সঙ্গ দেওয়া।
প্রথম দু’বছর হবে অত্যন্ত নিবিড় ও তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচিত পড়ুয়ারা দিল্লির প্রথম সারির বিদ্যালয়গুলিতে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করবেন। তাঁদের থাকার জন্য ছাত্র ও ছাত্রীদের পৃথক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ আবাসিক পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। উন্নত পরিকাঠামো ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এই পরিবেশ পড়ুয়াদের পড়াশোনা, আত্মোপলব্ধি এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশের এক আদর্শ বাতাবরণ নিশ্চিত করবে।
তবে এই দু’বছরের পর্বে কেবল শ্রেণিকক্ষের পঠনপাঠনই সব নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পাবেন পড়ুয়ারা, যাতে তাঁরা বাস্তব জীবনের নানা পেশা, প্রতিষ্ঠান ও মতাদর্শ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারেন। এই ধারাবাহিক মিথস্ক্রিয়া তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করবে এবং ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে পথ দেখাবে।
নেতৃত্ব কেবল পাঠ্যবই পড়ে অর্জন করা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, পরমতসহিষ্ণুতা ও আলোচনা, অভিজ্ঞদের দিকনির্দেশনা (মেন্টরশিপ) এবং বৃহত্তর জগতের সঙ্গে যোগসূত্র। তাই এই পাঠ্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যোগাযোগ দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বগুণ, ডিজিটাল দক্ষতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের ওপর।
দ্বাদশ শ্রেণি পেরনোর পরেও এই যাত্রা থামবে না। সংশ্লিষ্ট পড়ুয়ার নিজস্ব মেধা, আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য অনুযায়ী ভারত বা বিদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনার যাবতীয় পথ সুগম করবে ‘লিড ১০০’। কোনো আর্থিক বা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা যেন এক প্রতিভাবান তরুণের স্বপ্ন ও শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে পৌঁছনোর মাঝে প্রাচীর হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
শুধু স্নাতক বা স্নাতকোত্তর নয়; পিএইচডি বা পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার গোটা পথেই এই স্কলারদের পাশে থাকবে ‘লিড ১০০’—তাঁরা দেশে বা বিদেশে যেখানেই অধ্যয়ন করুন না কেন।
স্নাতক স্তর থেকে প্রত্যেক পড়ুয়া যুক্ত হয়ে যাবেন এক সুবিশাল পরামর্শক নেটওয়ার্কের (মেন্টরশিপ নেটওয়ার্ক) সঙ্গে। সেখানে তাঁদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকবে শিক্ষাগত ও ব্যক্তিগত দিকনির্দেশকদের। শিক্ষাগত মেন্টররা যেখানে পড়াশোনার গতিপ্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের পথ বাতলে দেবেন, ব্যক্তিগত মেন্টররা পাশে থাকবেন উচ্চশিক্ষা ও নাগরিক জীবনের নানা টানাপোড়েনে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি আর নৈতিক সাহস জোগাতে। এই নিরবচ্ছিন্ন সহায়তার লক্ষ্য একটাই—জীবনের এই লড়াইয়ে কোনো পড়ুয়া যেন নিজেকে একা না ভাবেন।
তবে কোনো নামী প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়াই কিন্তু শেষ কথা নয়। ‘লিড ১০০’-এর আসল সাফল্য নির্ধারিত হবে এই তরুণরা প্রাপ্ত সুযোগগুলিকে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে কীভাবে কাজে লাগাচ্ছেন, তার ওপর।
প্রকল্পটিতে এমন ছ’টি ক্ষেত্রকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যেখানে সুদক্ষ ও সমাজ-সচেতন নেতৃত্ব গভীর প্রভাব ফেলতে পারে: জননীতি, আইন, সামাজিক উদ্যোগ, কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট, প্রযুক্তি এবং সিভিল সার্ভিসেস। রাষ্ট্র পরিচালনা, বাণিজ্যিক বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, প্রশাসনিক ব্যবস্থার সচলতা কিংবা সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের মূল চাবিকাঠি থাকে এই ক্ষেত্রগুলিতেই। ‘লিড ১০০’ চায় এমন একঝাঁক যোগ্য নেতৃত্ব তুলে ধরতে, যাঁরা ভবিষ্যতে এসব শীর্ষ স্তরে অধিষ্ঠিত হবেন এবং তাঁদের প্রভাবকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাবেন।
এই উদ্যোগের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। দেশে মেধার কোনো ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও সংখ্যালঘু ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের প্রতিভাবান তরুণরা প্রায়শই শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালীদের তালিকায় অপূর্ণ প্রতিনিধিত্বের শিকার হন। সারা দেশ থেকে এমন প্রতিভাবান ছাত্রছাত্রীদের খুঁজে নিয়ে উপযুক্ত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের মূলস্রোতে তুলে আনার মাধ্যমে ‘লিড ১০০’ দেশের নীতিনির্ধারণী পরিসরে এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর এক অর্থবহ ও কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চায়।
তবে এই প্রতিনিধিত্বকে নিছক সংখ্যার নিরিখে দেখলে চলবে না। প্রত্যাশা হলো এমন কিছু নেতৃত্বের উত্থান, যাঁরা তাঁদের যোগ্যতা, সততা ও কাজের জন্য সর্বজনশ্রদ্ধেয় হবেন এবং একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নযাত্রায় নিজেদের সম্প্রদায়ের আবেগ ও প্রত্যাশাকে সার্থকভাবে তুলে ধরতে পারবেন।
‘লিড ১০০’-এর দর্শন তাই অত্যন্ত সরল, অথচ সুদূরপ্রসারী: অল্প বয়সেই অনন্য প্রতিভাকে চিহ্নিত করো, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও কর্মদক্ষতায় বিনিয়োগ করো, সেরা সুযোগগুলির সংস্পর্শে আনো এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করো।
এই পরিকল্পনাটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রূপায়িত। প্রথম পাঁচ বছরে গড়ে উঠবে ১০০ জন স্কলারের একটি ভিত, তবে তাঁদের সঙ্গে সংযোগ অটুট থাকবে কর্মজীবনের শেষ পর্যন্তও। সময়ের সাথে সাথে আশা করা যায়, তরুণ নেতৃত্বের এই শৃঙ্খল পেশাদার ও পরিবর্তনের কাণ্ডারিদের এক শক্তিশালী সমাজে রূপান্তরিত হবে, যাঁরা একে অপরের পাশে দাঁড়াবেন এবং নানাভাবে দেশ ও সমাজের উপকারে আসবেন।
‘হিউম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ বহু বছর ধরেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গ্রামীণ বিকাশ, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক ক্ষমতায়নে কাজ করে চলেছে। ‘লিড ১০০’ সেই বৃহত্তর মিশনেরই এক নতুন দিগন্ত। যেখানে বেশির ভাগ উন্নয়নমূলক কাজ কেবল তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, এই উদ্যোগ সেখানে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি তৈরিতে নজর দিয়েছে।
‘লিড ১০০’-এর মাধ্যমে মূলত মানবসম্পদের অপার সম্ভাবনায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে। লক্ষ্য কেবল ১০০ জন তরুণের সফল কর্মজীবন তৈরি করা নয়; আরও বড় আকাঙ্ক্ষা হলো—তাঁরা যেন ন্যায়পরায়ণ, আত্মপ্রত্যয়ী, দক্ষ এবং সমাজ-সচেতন নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে দেশ গড়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবেন।
নামে ‘১০০’ সংখ্যাটি থাকলেও, এর দৃষ্টিভঙ্গি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার বেড়াজালে আটকে নেই। আশা এই যে, এই একশো জন তরুণ আগামী দিনে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করবেন এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে এক সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল ভারত গঠনে দিশা দেখাবেন।



















