সম্পাদক সমীপেষু

মোদীর মোমবাতি প্রতিযোগিতা! কে জিতল, কে হারল?

ছবি : সংগৃহিত

আফরিদা খাতুন আঁখি : গতকাল ভারত এক অন্য রুপে চিত্রিত হল। ভক্তগণ ও আম সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রচেষ্টায় ভারত হাস্যাস্পদে পরিণত হল কি হল না, তাতে কিঞ্চিত ধন্দ থাকলেও, মোদীর আহ্বানে কাল ভারতের সংখ্যাগুরুগণ ভারতকে বিশ্বের চোখে বেশ অনেকখানি খাটো যে করলো এব্যাপারে সন্দেহ নেই। কিন্তু এতকিছুর পরেও শিক্ষিত ভক্ত আর সদ্য দীক্ষিত ভক্তগণ কিন্তু আঁতেল পাবলিকের মত জেনেশুনে ছাতি ফুলিয়ে যা করছে ঠিক করছে বলতে পিছপা নয় বরং তারা এই অবৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপের মধ্যে বিজ্ঞান আবিষ্কার করে নোবেল নেবার আয়োজন করছে।

তালি-থালি-মোমবাতি উৎসব নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে হাসির রোল পড়ছে বটে, কিন্তু গভীরে ভাবলে এই উৎসবের অন্তরালে রয়েছে বেশ কিছু সূক্ষ্ম পরিকল্পনা যা ভারত নামক স্বত্বাটা বিষিয়ে দিতে যথেষ্ট। ইতিমধ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি যে সমস্ত পদক্ষেপ বা ক্রিয়ালাপ গ্রহণ করেছে সেগুলো বাইরে থেকে হাসির ধ্বনিতে মুখরিত হলেও যার প্রত্যেকটার অন্তরালে ছিল ভারতকে হিন্দুত্ববাদী রঙে রাঙানোর একেকটা প্রয়াস। সে নোটবন্দি থেকে শুরু করে গোমূত্র হোক, আর হাঁসের দ্বারা অক্সিজেন তৈরীর কাহিনীই হোক।

উত্তর উত্তর বেড়ে চলছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ইতিমধ্যে চার হাজার মানুষের শরীরে নিজের বাসস্থান মজবুত করার আয়োজন নিচ্ছে করোনা মহাদেব। চোখের পালক ফেলতে না ফেলতে সংখ্যাটা কখন পাঁচ হাজার হয়ে যাবে তা আমরা বুঝতেও পারবো না। একশো মানুষ করোনার সাথে লড়াইয়ে হার স্বীকার করে নিয়েছে। পরিকল্পনাহীন লকডাউনের দায়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে, বারাণসীতে শিশুরা অনাহারে গাছের পাতা খেয়ে খিদে মেটানোর চিত্র ফুটে উঠেছে গুটিকয়েক হলুদ আবরণহীন সংবাদ মাধ্যমে। দীর্ঘ স্তব্ধতা এই সংখ্যাকে যে আরও বৃদ্ধি করবে তাতে সন্দেহ নেই। এই মৃত্যুমিছিলে দাঁড়িয়ে কাল যে উৎসবের রুপ ভারতবর্ষে দেখেছি তা যেন গত কয়েক বছর আগে কল্পনাতীত ছিল। দীর্ঘ তিন সপ্তাহ লকডাউনের মাধ্যমে যে করোনাকে স্তব্ধ করার প্রয়াস নেওয়া হল, সেই করোনাকে আবার তার থাবা বসানোর জন্য পথ উন্মুক্ত করে দিল গতকালের মোমবাতি মিছিল। যদিও এই প্রশ্ন তুললেই মোদীজী আবার ‛ভাইয়ো বেহনো’ বলে সুমিষ্ট ভাষায় বলবেন “আমি মোমবাতি বেলকানিতে জ্বালাতে বলেছিলাম রাস্তায় না।” যেখানে তিনি এই ব্যাপার আগে ঘটতে দেখেছেন তালি-থালি বাজানোর সময় সেখানে তিনি কোন সাহসে এই ঘটনার পুনরাবৃত্ত ঘটালেন, আর কত মানুষের জীবন নিয়ে খেলবেন? যেখানে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিষেবা না থাকার কারণে একের পর এক ডাক্তার-নার্স আক্রান্ত হচ্ছেন সেখানে মোমবাতি জ্বালিয়ে বায়ু মণ্ডলের বিশুদ্ধতাকে পুনরায় সিওটু দিয়ে ভরিয়ে আবার কী রোগের দোহাই দিয়ে মোটা ত্রাণ নিজের পকেট ফেলার আয়োজন করছেন? নাকী চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে সার্বিয়ার মতো অন্য দেশের সাথে ব্যবসা করে মুনাফা লুটবেন?

হাংগার ইনডেক্সে যে দেশের স্থান দিন দিন তলানিতে ঠেকছে সে দেশের নয় মিনিট সমস্ত আলো বন্ধ করে মোমবাতি জ্বালিয়ে গরীবদের পাশে থাকার অঙ্গীকারটা বড়ই হাস্যকর লাগে। যে সমস্ত বাবুরা দিনের আলোয় অনাহারে ক্লান্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর কীটনাশক স্প্রে করতে দেখে নিজের বাক্য ব্যায় করতেও কার্পণ্য বোধ করে, যারা অনাহারে কঙ্কালসার দেশের চিত্র দেখেও নিজের বার্গার, চিকেন ললিপপ খাওয়ার ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড করতে লজ্জা বোধ করে না, তাদের নয় মিনিট আলো নিভিয়ে গরিবদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করাটা আর যাইহোক কোন অর্থেই যুক্তিযুক্ত লাগে না। গতকালকের মোমবাতি জ্বালানো কোন অঙ্গীকার ছিল না বরং ছলে বলে কৌশলে ভারতীয় জনতা পার্টির জন্মদিবস পালনের উৎসব ছিল।

ভারত নামক বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশে যেখানে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মানুষের বাস সেখানে তালি-থালি-মোমবাতি-প্রদীপের মাধ্যমে দেশের শিরা উপশিরাতে হিন্দুত্ববাদ প্রবেশ করাতে এতটাই উদগ্রীব এই দেশের প্রধানমন্ত্রী যে মারাণ রোগেও তার ফায়দা লুটতে পিছপা হয়নি এর থেকে লজ্জাজনক আর কী হতে পারে? তবে এসব ভক্তনামাবলীর উর্দি গায়ে জড়ানো শিক্ষিত-সেলিব্রিটি গোঁয়ারদের কিচ্ছু যায় আসে না কারণ তারা তাদের বিবেক হিন্দুত্ববাদীর কাছে বিক্রি করেছে বাজার ধরার তাগিদে।

কাল রাতে আমার পাশের পাড়াতে মোমবাতি উৎসবের জন্য যে কারেন্ট ট্রান্সফর্মার মেন অফ করা নিয়ে অর্ধশতাব্দী ধরে একত্রে বসাবস করা হিন্দু মুসলিমের মধ্যে যে সহিংস্রতাতে পরিবেশ বিষিয়ে গেল, যে সমস্ত গৃহ গুলো কাল মোমবাতি, আতসবাজির উন্মাদে অগ্নি সংযোগ ঘটালো তার জবাব কে দেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? আর কতো খেলবেন? আর কতো নগ্ন করবেন এই দেশের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে? আর যারা এই বিজ্ঞানের যুগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রাষ্ট্রীয় অবৈজ্ঞানিক কার্যকলাপ সম্মতিতে মোমবাতি জ্বালালেন, আপনারও কিন্তু এই দেশকে খুন করার অপরাধে অপরাধী। মনে রাখবেন শাড়ি থেকে সর্টস, ধুতি থেকে জিন্স পোশাক আর বিলাসিতাতে বদল ঘটালেই কুসংস্কার মুক্ত হওয়া যায় না, কুসংস্কার বাসা বাঁধে বিবেকে আর আপনারা এখনো কুসংস্কারের অন্তরালে বাস করছেন কাল তা আরও একবার প্রমাণ হল। এই কঠিন দুর্যোগে মোমবাতি জ্বালিয়ে ও আতসবাজি করে নিজেকে অঙ্গীকারবদ্ধ না করে যদি প্রতিবেশীর দুর্দিনে উনুন জ্বালাতে অঙ্গীকারবদ্ধ হতেন তাহলে হৃদয় তথা দেশের হৃদয় আরো আলোকিত হতো।

লেখিকা : রিসার্চার, সোসিও এডুকেশনল রিসার্চ সেন্টার (সার্ক)

Leave a Reply

error: Content is protected !!