Saturday, August 15, 2026
Latest Newsইতিহাসফিচার নিউজ

হাকিম আজমল খান, স্বাধীনতা লড়াইয়ে এই মুসলিম কংগ্রেস নেতার অবদান ভুলে গেছে খোদ কংগ্রেসিরাও

দৈনিক সমাচার, ডিজিটাল ডেস্ক: ১৮৬৮ সালের ১৭ শাওয়াল (১২৮৪ হিজরি) জন্ম নেওয়া হাকিম আজমল খান (১৮৬৮–১৯২৭) কেবল একজন চিকিৎসকই ছিলেন না; বরং উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয় রাজনীতির ইতিহাসে তিনি এক ভাস্বর ব্যক্তিত্ব। চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকে শুরু করে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও জাতীয় ঐক্য গঠনে তাঁর অবদান অতুলনীয়।

চিকিৎসা জগতের মুকুটবিহীন রাজা

হাকিম আজমল খানের পরিবার ছিল ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাবিদের পরিবার। তাঁর দাদা হাকিম শরিফ খান মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের রাজবৈদ্য ছিলেন এবং তিনি ‘শরিফ মঞ্জিল’-এর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শৈশবে প্রথাগত ইসলামিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আরবি ও ফারসি ভাষা শেখার পর তিনি দিল্লির সিদ্দিকি দাওয়াখানার হাকিম আবদুল জামিলের তত্ত্বাবধানে ইউনানি চিকিৎসায় শিক্ষা সমাপ্ত করেন। পরবর্তীতে তিনি রামপুরের নবাবের চিকিৎসক নিযুক্ত হন।

তিনি মানুষের কাছে ‘মসিহায়ে হিন্দ’ (ভারতের সুস্থকারক), ‘মসিহুল মুলক’ এবং ‘মুকুটবিহীন রাজা’ উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর রোগ নির্ণয়ের ক্ষমতা ছিল কিংবদন্তীতুল্য; কেবল রোগীর চেহারা দেখেই তিনি রোগ বুঝে ফেলতে পারতেন। চিকিৎসাসেবায় তাঁর মহানুভবতা ছিল অনন্য—শহরের বাইরে যাওয়ার জন্য ফি হিসেবে ১০০০ টাকা নিলেও, দিল্লির নিজ চেম্বারে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে তিনি সামাজিক অবস্থা বিবেচনা না করে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিতেন। বিশ শতাব্দীতে দিল্লিতে ‘তিবিয়া কলেজ’ স্থাপনের মাধ্যমে তিনি ভারতে ইউনানি চিকিৎসার পুনর্জাগরণ ঘটান। এছাড়া তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন এবং ১৯২০ সাল থেকে আমৃত্যু (১৯২৭) এর প্রথম চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতা আন্দোলন ও রাজনৈতিক অবদান

চিকিৎসার গণ্ডি পেরিয়ে আজমল খান নিজেকে সঁপে দেন দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি তিনি উর্দু সাপ্তাহিক ‘আকমল-উল-আখবার’-এ লেখালেখি শুরু করেন। ১৯০৬ সালে শিমলায় ভারতের ভাইসরয়ের সাথে সাক্ষাত করা মুসলিম প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন এবং স্মারকলিপি পেশ করেন। একই বছরের ৩০ অক্টোবর ঢাকার নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন।

মহাত্মা গান্ধীর সাথে তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং খিলাফত আন্দোলনে অনন্য নেতৃত্ব দেন তিনি। অনেক মুসলিম নেতা গ্রেপ্তার হলে তিনি মহাত্মা গান্ধীর সহায়তা চান এবং গান্ধীজির সাথে আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মুহাম্মদ আলি ও মাওলানা শওকত আলির মতো বিশিষ্ট নেতাদের এক মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ করেন। উল্লেখ্য, তিনি একই সাথে জাতীয় কংগ্রেস, নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ও নিখিল ভারত খিলাফত কমিটির প্রধান হওয়ার বিরল গৌরব অর্জনকারী একমাত্র ব্যক্তি। ১৯২১ সালে গুজরাটের আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে তিনি দলের পঞ্চম মুসলিম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

জীবনাবসান ও উত্তরাধিকার

১৯২৭ সালের ২৮ বা ২৯ ডিসেম্বর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এই মহান ব্যক্তিত্ব মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া সমস্ত সরকারি উপাধি বর্জন করে দেশপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। স্বাধীনতা, জাতীয় ঐক্য ও অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক এই মহান নেতার জীবন ও আদর্শ বর্তমান প্রজন্মের কাছে চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

error: Content is protected !!
WordPress Workshop YITH WooCommerce Catalog Mode Premium YITH WooCommerce Checkout Manager Premium YITH WooCommerce Color and Label Variations Premium YITH WooCommerce Compare Premium YITH WooCommerce Coupon Email System Premium YITH WooCommerce Custom Order Status Premium YITH WooCommerce Customer History Premium YITH WooCommerce Customize My Account Page Premium YITH WooCommerce Delivery Date Premium YITH WooCommerce Deposits and Down Payments Premium