দৈনিক সমাচার, ডিজিটাল ডেস্ক: ইতিহাস অনেক রাজত্ব ও সম্রাজ্যের জন্ম ও মৃত্যুর সাক্ষী। কিন্তু ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শক্তির মসনদ কাঁপিয়ে দিয়ে যাঁরা নিজেদের ভূখণ্ডে স্বাধীন সরকারের পতাকা উড়িয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে কেরলের মালাবার অঞ্চলের ভারিয়ান কুন্নাথু কুঞ্জাহামেদ ‘হাজি’র নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ব্রিটিশদের দেওয়া শর্তের জবাবে তাঁর বলা একটি বাক্য আজও পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করা মানুষের রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দেয়— “ক্ষমা চাইতে হলে, মক্কার চেয়ে আমার কাছে মৃত্যুই শ্রেয়!”
কেরালার ইতিহাসে কুঞ্জাহামেদ হাজি কেবল একজন নামমাত্র বিদ্রোহী ছিলেন না; তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাপিয়ে দেওয়া এক ত্রাস। প্রচলিত ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, উত্তর কেরালার আনাচে-কানাচে ব্রিটিশবিরোধী প্রচারে এক অনন্য ভূমিকা নিয়েছিলেন এই নেতা। মালয়ালম, আরবি এবং কিছুটা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হাজি জানতেন সাধারণ মানুষের মন জয় করার আসল চাবিকাঠি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জনমত গড়তে তিনি তথাকথিত প্রথাগত রাজনৈতিক ভাষণের পাশাপাশি ব্যবহার করেছিলেন কেরালার প্রাচীন নিজস্ব মার্শাল আর্টসের নানা কায়দা এবং স্থানীয় লোকসংগীত ও পল্লীগান। আর এই আকর্ষণীয় প্রচারের মাধ্যমেই তিনি এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন—গড়ে তুলেছিলেন প্রায় ৭৫ হাজার লড়াকু মানুষের একটি শক্তিশালী বাহিনী।
১৯২০ সালের আগস্ট মাস। কেরালার এক মসজিদে ব্রিটিশদের নির্মম হামলা ও পবিত্রতা লঙ্ঘনের ঘটনাটিই যেন স্ফুলিংগ হয়ে দেখা দিল। ক্ষোভে ফেটে পড়া কুঞ্জাহামেদ হাজি আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করেননি। তাঁর নেতৃত্বে সেই বিশাল বাহিনী ঝড়ের বেগে চড়াও হয় ব্রিটিশ থানা এবং বিভিন্ন সরকারি দফতরে। ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে মালাবারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
প্রায় এক বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ১৯২১ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে হঠিয়ে দিয়ে মালাবারের মাটিতে নিজের স্বাধীন প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেন হাজি। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের মুখের ওপর জবাব দিয়ে প্রায় ছ’মাস ধরে স্বাধীন মালাবারের মাটিতে রাজত্ব করেছিলেন তিনি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের চোখে যা ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ, স্থানীয় সাধারণ মানুষের কাছে তা ছিল মুক্তির নিঃশ্বাস।
তবে সাম্রাজ্যবাদের লোলুপ দৃষ্টি বেশি দিন স্বাধীন এই সরকারকে সহ্য করতে দেয়নি। ব্রিটিশদের সম্মিলিত সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের এক পর্যায়ে বিশ্বাসঘাতকতা ও চক্রান্তের শিকার হন তিনি। মাস ছয়েকের মাথায় ঘাতকদের হাতে গ্রেফতার হন কুঞ্জাহামেদ হাজি।
গ্রেফতারের পর ব্রিটিশ কর্তারা বুঝেছিল তাঁকে সহজে দমানো যাবে না। তাই শুরু হয় প্রলোভনের খেলা। ব্রিটিশরা প্রস্তাব দিয়েছিল, নিজের কৃতকর্মের জন্য কেবল একটিবার ক্ষমা চেয়ে নিলেই তাঁকে ফাঁসি থেকে রেহাই দিয়ে সোজা পবিত্র মক্কা শরিফে পাঠিয়ে দেওয়া হবে পুণ্য অর্জনের জন্য! কিন্তু আপসহীন বীর কুঞ্জাহামেদ হাজি সেই প্রস্তাব লাথি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, ব্রিটিশের কাছে ক্ষমা চেয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু ঢের শ্রেয়।
শেষ পর্যন্ত ১৯২১ সালের সেই অন্ধকার অধ্যায়ে ব্রিটিশের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেন কুঞ্জাহামেদ হাজি। বুলেট তাঁর শরীরকে ভেদ করতে পেরেছিল ঠিকই, কিন্তু কেরালার মাটি থেকে এবং স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে তাঁর বীরগাথা মুছে ফেলতে পারেনি। আজও মালাবারের বাতাসে ভেসে বেড়ায় সেই অকুতোভয় নেতার অমর স্লোগান—স্বাধীনতাই জীবন, পরাধীনতায় মৃত্যু।