Latest Newsফিচার নিউজসম্পাদক সমীপেষু

মিঠুন কি নিজের অভিনয়ের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন?

মোহাম্মাদ আবু হানিফা: শিল্প-সাহিত্য মানবতার উৎস থেকে উৎসারিত প্রস্ববন। যত চর্চা করা হয় ততই দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। কেবল দক্ষতা বৃদ্ধি পায় তা নয়, বরং নিজের ব্যবহারিক জীবন মানবতার  আলোকে উদ্ভাসিত হয়। ভারতীয় দর্শন অনুযায়ী কেবল জ্ঞাননের জন্য জ্ঞান চর্চা নয়। বরং জীবন কে পরিচালিত করার জন্য জ্ঞান চর্চা। তাই চর্চিত জ্ঞান অনুযায়ী চরিত্র অর্জিত হওয়াই কাম্য। এই কামনার আলোকে মিঠুন চক্রবর্তীর জীবন বিশ্লেষণ করলে আমরা কি পাই? তার চলচ্চিত্র জীবন আর আজকের বাস্তব জীবন  কি ঐক্যসূত্রে গাঁথা? না, তার ছন্দ পতন ঘটেছে? তা একটু খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়।

মিঠুন পড়া-শুনার জীবনে একজন মেধাবী ছাত্র। মৃণাল সেনের ‛মৃগয়া’ সিনেমার মধ্য দিয়ে তার চলচ্চিত্র জীবনে প্রবেশ। একের পর এক সফল অভিনয়ের মাধ্যমে সিনেমা জগতের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আসন করে নেন বাংলা সিনেমার এই স্বনামধন্য তারকা। তার অভিনীত সিনেমার প্লট, বিষয়বস্তু ও লক্ষ্যের সাথে আজকের মিঠুনের এক অস্বাভাবিক ছন্দ-পতন। নীচে তার অভিনীত কয়েকটি সিনেমার প্লট নিয়ে আলোচনা করলে সহজেই বোঝা যায়, মিঠুনের অভিনীত সিনেমার বিপক্ষে অবস্থান কেবল বিজেপির নয়, বরং মিঠুন স্বয়ং তার অভিনীত সিনেমার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছেন।

মিঠুনের ‛জাগ উঠা ইনসান’ দেখলে সবারই ইনসানিয়্যাত (মানবতা) জেগে উঠে। এই সিনেমায় সন্ধ্যা নামে উচ্চ বর্ণের নারীর সাথে হরি নামক নিন্ম বর্ণের এক পুরুষের ভালোবাসার মিলনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠে। অবশেষে, নান্দু নামক পুরোহিতের সাথে হৃদয় দগ্ধ করা বিরহ নিয়ে সন্ধ্যার বিয়ে হয়। এই সিনেমাতে বর্ণাশ্রম প্রথার প্রতি সজোরে চপোঠাঘাত করা হয়েছে। আজকে বিজেপির নেতারা নিন্ম বর্ণের হিন্দুদের সাথে যে কোলাকুলি  করে ছবি তুলছে তা ছায়া ছবির মতই স্যুটিং। তাদের মূল সংগঠনের যে দর্শন তা মূলত উচ্চ বর্ণের মানুষদের উচ্চ আসনে বসানোর হীন প্রয়াস ব্যতীত অন্য কিছু নয়। যে বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদীদের প্রতিভূ সেই দলে যোগদান করে মিঠুন কি তার অভিনীত সিনেমার বিপক্ষে অবস্থান নিলেন? এটা কিন্তু প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে উঠেছে।

মিঠুন মঞ্চে উঠে  ভাষন দিতে গিয়ে বলেন, ‛আমি জাত গোখরো, এক ছোবলেই ছবি’। প্রশ্ন হচ্ছে, তার এই ফনা কাদের দিকে? মুসলিমদের দিকে? তা যদি হয় তাও তো তার অভিনীত সিনেমার প্রতি কটাক্ষ। তার অভিনীত সিনেমাতে আমরা দেখেছি দাড়ি ওয়ালা মিঠুন, টুপি পরা মিঠুন এবং মুসলিম পোষাকে সজ্জিত মিঠুন কে। মুসলিমদের প্রতি তার সীমাহীন মর্যাদা বোধ। ‛তুল কালাম’ সিনেমাতে আমরা দেখেছি, মিঠুন তার ডায়লগে উল্লেখিত ‛ভালো মানুষ’ নাসির চাচাদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বাস্তবে  তার যে অবস্থান ও বক্তব্য তা কি নাসির চাচাদের বিপক্ষে নয়? অভিনয় মানে যে মিথ্যা তাকি  বাস্তবে প্রমাণ করতে চাইছেন মিঠুন চক্রবর্তী? মিঠুনের সিনেমাতে দেখেছি বস্তি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কৌশলের উত্তেজনা পূর্ণ একশন। দেশের মানুষ কে যারা দেশ ছাড়া করতে চাই তাদের সাথে মিঠুন যখন হাত মেলায় তখন মনে হয় সিনেমার মিঠুন সিনেমার জন্য  জন্য অভিযোজিত। অভিনীত সিনেমার আলোকে তিনি আলোকিত নন।

আমরা মিঠুনের অভিনীত ‛আদত’ সিনেমাতে দেখেছি , শিবনাথ শাস্ত্রীর ছেলে (মিঠুন) শংকর। এক অসহায়, হতদরিদ্র মুসলিম মেয়ে সালমা কে বাড়িতে তুলে আনে। আজকে দিনে বিজেপি এটা কে কি চোখে দেখছে? মুসলিম হিন্দু যুবক-যুবতীদের মধ্যে অনিচ্ছাকৃত ভাবেই ভালোবাসা গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু, বিজেপি ইচ্ছাকৃত ভাবেই এর নাম দিয়েছে লাভ জিহাদ। এই ধরনের লাভ জিহাদ মিঠুনের অভিনীত সিনেমাগুলিতে অনুপস্থিত নয়। এর অর্থ হল, বিজেপি মিঠুনের অভিনীত সিনেমার প্লট ও  লক্ষ্যের বিপক্ষে। কিন্তু, অভিনয়ের মধ্যে বিজেপির ভাবধারা – বিরোধী মিঠুন বাস্তবে বিজেপির পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে নিজের অভিনীত সিনেমার বিপক্ষে কিভাবে অবস্থান গ্রহণ করলেন?

কিছু কিছু সিনেমাতে নায়ক – নায়িকাদের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়। আবার সবগুলো সিনেমা মিলে নায়ক নায়িকাদের বহুমুখী চরিত্রের অধিকারী হতে হয়। এরই ধারাবাহিকতা ধরে যদি মিঠুন চক্রবর্তী নকশালদের সাথে প্রতিবাদীর অভিনয় করে থাকেন, সিপিএমের সাথে কমিউনিস্ট সাজার চেষ্টা করে থাকেন, দিদির সাথে ভাই সাজার চেষ্টা করে থাকেন আর আজকে দিনে হিন্দুত্ববাদের সাথে মনুবাদী সাজার চেষ্টা করে থাকেন তাহলে বলব কেবল রুপোলী পর্দায় নয় বাস্তবের মাটিতে ও তিনি মানুষের সাথে অমানবিকভাবে সফল অভিনয় করে চলেছেন – এতে কোন সন্দেহ নেই।

 

Leave a Reply

error: Content is protected !!