দৈনিক সমাচার, ডিজিটাল ডেস্ক: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে কয়েকটি নাম চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে, তাঁদের মধ্যে মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর অন্যতম। সাধারণ কৃষক পরিবার থেকে উঠে এসে যিনি বাংলার মাটি থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও অত্যাচারী জমিদারদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় হলো নারকেলবেড়িয়া গ্রামের ঐতিহাসিক ‘বাঁশের কেল্লা’ এবং তাঁর অসম সাহসিকতার সঙ্গে ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর ১৭৭২ সালে চব্বিশ পরগনা জেলার বাদারিয়া থানার হায়দারপুর গ্রামে জন্ম নেন। তিনি ছিলেন এক সাধারণ কৃষকের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই নিজ চোখে তিনি গ্রামীণ কৃষকদের ওপর স্থানীয় জমিদার, নীলকর সাহেব এবং ব্রিটিশদের নির্মম অত্যাচার ও শোষণ দেখতে পেয়েছিলেন।
তরুণ বয়সেই তিনি নিরীহ ও নিপীড়িত কৃষকদের রক্ষা করার কঠিন শপথ নেন। নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে তিনি নিজে থেকেই মুষ্টিযুদ্ধ, লাঠিখেলা এবং তরবারি চালনা শেখেন। ধীরে ধীরে তাঁর চারপাশে গড়ে উঠতে থাকে এক বিশাল অনুসারী বাহিনী।
‘তরিকায়ে মুহাম্মদীয়া’ আন্দোলন ও তিতুমীরের দীক্ষা
১৮১৮ সালে উত্তরপ্রদেশের রায়বেরিলির সৈয়দ আহমদ ধর্মীয় গোঁড়ামি আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক আন্দোলন গড়ে তোলেন। ইতিহাসবিদরা এই আন্দোলনকে ‘ওয়াহাবি আন্দোলন’ হিসেবে অভিহিত করলেও, সৈয়দ আহমদ নিজে একে ‘তরিকায়ে মুহাম্মদীয়া’ বলতেন।
১৮২১ সালে তিনি কলকাতার পথ ধরে হজের উদ্দেশ্যে মদিনায় যান। কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে হজব্রত পালন করতে মদিনায় যান তিতুমীরও। সেখানে দুই মহান ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎ ঘটে। সৈয়দ আহমদের সুগভীর পাণ্ডিত্য এবং তাঁর সরল, অনাড়ম্বর জীবনযাপন দেখে গভীরভাবে মুগ্ধ হন তিতুমীর। তিনি তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং দীক্ষিত হন।
দেশে প্রত্যাবর্তন ও আন্দোলন বিস্তার
দুই বছর মদিনায় অবস্থান শেষে দেশে ফিরে এসে তিতুমীর চব্বিশ পরগনা ও নদিয়া জেলায় ‘তরিকায়ে মুহাম্মদীয়া’ আন্দোলন জোরদার করেন। ১৮২৭ সাল থেকে এই ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নেয় অত্যাচারী জমিদার, নীলকর এবং ইংরেজবিরোধী এক শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আন্দোলনে।
তিতুমীরের অভাবনীয় উত্থানে ভীত হয়ে পড়ে এলাকার তৎকালীন জমিদাররা। স্থানীয় জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র দেব তিতুমীরকে শায়েস্তা করার জন্য বারবার তাঁর লাঠিয়াল বাহিনী পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু তিতুমীরের প্রশিক্ষিত বাহিনীর কাছে তারা প্রতিবারই পরাস্ত হয়ে লজ্জাজনকভাবে ফিরে আসে।
দাঁড়ির ওপর কর এবং প্রথম বিদ্রোহ: পরাজয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র দেব এক অদ্ভুত ও অপমানজনক কাণ্ড করে বসেন। তিনি সাধারণ মানুষের ‘দাঁড়ি’ রাখার ওপর কর বসিয়ে তা জোরপূর্বক আদায় শুরু করেন। এতে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ১৮৩০ সালের ৬ নভেম্বর প্রায় ৩০০ অনুসারী নিয়ে জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র দেবের বাড়ি পুঁড়া গ্রামে হামলা চালান তিতুমীর। এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষই ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জমিদারদের যৌথ আক্রমণ ও তিতুমীরের বিজয়
এর পর থেকেই তিতুমীর জমিদার ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দেন, কেউ যেন ইংরেজদের কোনো খাজনা না দেয়, বরং সেই খাজনা তাঁর কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এই ঘোষণা মানতে নারাজ হন জমিদাররা।
- গোবরডাঙ্গার জমিদার কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় তিতুমীরকে কর দিতে সরাসরি অস্বীকার করেন।
- কালীপ্রসন্নকে সাহায্য করতে তাঁর বন্ধু লাটবাবু কলকাতা থেকে ২০০ হাবশি পাইক পাঠান।
- মোল্লাহাটি নীলকুঠির ম্যানেজার পাঠায় আরও ২০০ লাঠিয়াল।
- এছাড়া কালীপ্রসন্নর নিজস্ব বাহিনীতে ছিল ৪০০ পাইক, ২০০ লাঠিয়াল এবং বেশ কয়েকটি হাতি।
এত বিশাল যৌথ বাহিনী নিয়ে তিতুমীরের ওপর আক্রমণ চালানো হলেও, বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে তাদের পুরোপুরি তাড়িয়ে দেন তিতুমীর।
আলেকজান্ডারের অভিযান ও ইংরেজদের পরাজয়
জমিদারদের এই শোচনীয় পরাজয়ের পর টনক নড়ে খোদ ইংরেজদের। বাংলার ছোটলাটের নির্দেশে কলকাতা থেকে সিপাহিদের একটি দল পাঠানো হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডারের নেতৃত্বে এবং বশিরহাটের দারোগা রামলাল চক্রবর্তীর দলবল নিয়ে নারিকেলবেরিয়ায় চালানো হয় অতর্কিত অভিযান।
ঠিক তখনই তিতুমীরের নির্দেশে তাঁর ভাগিনা গোলাম মাসুম পাঁচশ অনুসারী নিয়ে ইংরেজ বাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। ইংরেজ বাহিনী তাদের আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিন্দুমাত্র সুযোগও পায়নি। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে প্রাণভয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার। ঘটনাস্থলেই আটক হন দারোগা রামলাল। এই যুদ্ধে ইংরেজ পক্ষের একজন জমাদার, ১০ জন সিপাহি এবং ৩ জন বরকন্দাজ নিহত হয়।
স্বাধীনতার ঘোষণা ও ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লা নির্মাণ
এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর তিতুমীর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সরাসরি স্বাধীনতা দাবি করেন এবং নিজেকে স্বাধীন বাদশা বলে ঘোষণা করেন। তাঁর এই সরকারের মঈনুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন গোলাম মাসুম ওরফে মাসুম খাঁ।
তিতুমীর জানতেন, ইংরেজরা সহজে এই স্বাধীনতার ঘোষণা মেনে নেবে না। তাই আসন্ন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি নির্মাণ করেন ইতিহাসখ্যাত সেই ‘বাঁশের কেল্লা’। এই কেল্লার সঙ্গে জড়িয়েই আজো বাঙালির চেতনায় অমর হয়ে রয়েছে তিতুমীরের নাম।
১৮৩১ সালের ১৩ নভেম্বর: যুদ্ধের সূচনা
১৮৩১ সালের ১৩ নভেম্বর সন্ধ্যা। পুরো নারিকেলবেড়িয়া গ্রাম ঘিরে ফেলে বিশাল ইংরেজ বাহিনী। রাতেই ইংরেজ বাহিনীর ওপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন মীর নিসার আলী তিতুমীর। তাঁর নির্দেশ পেয়ে সেনাপতি মাসুম খাঁ একযোগে আক্রমণ পরিচালনা করেন।
তীর-ধনুক, বর্শা, ইটের টুকরা আর কাঁচা বেলের আকস্মিক আক্রমণে ইংরেজ বাহিনীর অনেকেই আহত হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরের দিন সকালে ইংরেজ বাহিনীর দায়িত্বে থাকা কর্নেল একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এনে তিতুমীর বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে কেল্লার প্রধান দরজায় তরবারি দিয়ে গেঁথে দিয়ে যান।
অসম যুদ্ধ ও বাঁশের কেল্লার পতন
ইংরেজদের এই আহ্বানে তিতুমীর বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো সাড়াই দেওয়া হলো না। অপমানিত বোধ করে কর্নেল নিজ বাহিনীতে ফিরে গিয়ে কেল্লা আক্রমণের চরম নির্দেশ দেয়।
শুরু হয় বন্দুকের মুহুর্মুহু গুলিতে কেল্লার বাসিন্দাদের অস্থির করে তোলার পালা। কেল্লার দিকে তাক করা হয় বেশ কিছু ভারী কামান। আত্মসমর্পণ না করলে কামান দাগাতে দ্বিধা করবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয় ইংরেজরা। কিন্তু এত কিছুর পরও আত্মসমর্পণ তো দূরের কথা, উল্টো তীব্র পাল্টা আক্রমণ চালায় তিতুমীরের বাহিনী। এই প্রতিরোধে পিছু হটতে বাধ্য হয় ইংরেজরা।
এমন আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকে বেশ কয়েক দিন ধরে। অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে এই অসম যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকেন তিতুমীর। কিন্তু দীর্ঘ প্রতিরোধ ভেঙে দিতে একসময় আধুনিক কামান ব্যবহার শুরু করে ইংরেজরা। কামানের গোলার আঘাতে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে তিতুমীরের গর্বের বাঁশের কেল্লা।
বীরের মৃত্যু ও অমরত্ব
যুদ্ধের একপর্যায়ে হঠাৎ একটি কামানের গোলা এসে সরাসরি আঘাত করে তিতুমীরের ডান ঊরুতে। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাঁর বীরের পা।
অবশেষে ১৯ নভেম্বর এভাবেই শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়তে লড়তে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দেন অকুতোভয় বীর মীর নিসার আলী তিতুমীর। ধ্বংস হয়ে যায় তাঁর গড়া ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লা। সেই দিনই গ্রেপ্তার করা হয় তিতুমীরের বিশ্বস্ত সেনাপতি মাসুম খাঁসহ আট শতাধিক বীর সেনানিকে।
তিতুমীরের এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি; তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।



















