Wednesday, September 30, 2026
গল্পফিচার নিউজশিল্প-সাহিত্য

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ০৫)

মুহসীন মোসাদ্দেক

 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

ক্লাসে আর বিশেষ কিছু ঘটলো না। স্যার যে খুব রাগী সে প্রমাণও মিললো না। কে জানে স্যারের মনটা হয়তো আজ ভালো ছিল।

ক্লাস শেষে স্যার চলে যেতেই শেফালি এসে দাঁড়ায় লাবুদের বেঞ্চের পাশে। দাঁড়িয়েই খিলখিল করে হাসে। হাসতে হাসতে লাবুকে উদ্দেশ করে বলে, ‘ওই মিয়া, আমার রোল ডাকতেই ওইরকম ফাল দিয়া উঠলা ক্যান!’ বলেই আবার খিলখিল করে হাসতে থাকে।

শেফালির হাসিতে লাবুর গা জ্বলে, কিন্তু তা প্রকাশ করে না, স্বাভাবিকভাবেই জবাব দেয়, ‘আসলে আমার স্কুলে আমার ক্লাস রোলও তিন তো তাই ভুল করে—’ লাবু কথা শেষ না করে মাথা চুলকাতে থাকে।

লাবুর কথা শুনেই শেফালি আবার খিলখিল করে হেসে ওঠে, বলে, ‘ওমা, কিরাম কইরা কথা কয়!’

সুরুজ তেতে ওঠে, ‘ওই, এইরকম কইরা হাসতিছিস ক্যান? হাসির কী কথা কইলো লাবু!’

‘ওর কথা কওয়ার ঢঙে আমার হাসি পাইতিছে। হি হি হি—’ শেফালি হাসতেই থাকে।

সুরুজ আবার তেতে ওঠে, ‘ওই, হাসবি না কইলাম, একদম হাসবি না।’

শেফালি এবার মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, ‘আমার ইচ্ছা হইছে আমি হাসতেছি। তোর ইচ্ছা হইলে তুই বইসা বইসা কান্দ। কিন্তু আমার হাসি নিয়া বেশি পটর পটর করবি না।’

শেফালি খিলখিল করে হাসতে হাসতে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে। সুরুজ আর কিছু বলার সুযোগ পায় না। শেফালি নিজের জায়গায় গিয়ে বসেও হাসতে থাকে। লাবু অবাক হয়। মেয়েটা কী সবসময়ই এভাবে হাসে! তার কী হাসির রোগ আছে! শেফালির হাসিতে লাবুর আর গা জ্বলে না। কেন জানি ভালোই লাগে। কেন, সেটা বুঝতে পারে না লাবু, বোঝার চেষ্টাও অবশ্য করে না।

শেফালিকে ভালো করে লক্ষ্য করে লাবু। হালকা-পাতলা গড়ন, শ্যামা বরন। চুল পিঠ ছুঁয়েছে, বেণী করে রেখেছে। মাথার পেছনে চুলগুলো দুই ভাগ করে দুই পাশে দুইটা বেণী করে রেখেছে। বেণীর আগায় লাল-নীল ফিতা দিয়ে ফুলের মতো করে বাঁধা আছে। শেফালিকে অবশ্য লাবু আজই প্রথম দেখছে না। ওদের বাড়ির কাছাকাছিই শেফালিদের বাড়ি। কিন্তু এর আগে কখনো আলাপ-পরিচয় হয় নি। রুবেলদের সাথেও বিশেষ একটা সম্পর্ক নেই।

শেফালি এখনো হাসছে। অনেকটা পাগলির মতো। এত হাসি তার কোথায় থেকে আসছে কে জানে! লাবু আর সেটা নিয়ে ভাবতে যায় না।

পরের ক্লাস জানেমান স্যারের। স্যার ক্লাসে আসে একটা পত্রিকা হাতে করে, বেশ গম্ভীর অথচ খুশি খুশি মুখে। রুবেল লাবুকে চিমটি দেয়। লাবু নিজেও বুঝে যায় আজ স্যারের কবিতা ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। পত্রিকা খুলে নিজের কবিতার দিকে চেয়ে থাকার সে দৃশ্যটা লাবু আজই দেখতে পাবে।

স্যার চেয়ারে বসে বলে, ‘অ্যাই, সবাই বই খুলে জসীমউদ্দীনের কবিতাটা মুখস্থ করে ফেলো।’

মুহূর্তেই বইয়ের পাতার খসখস শব্দ শুরু হলো। লাবুও খুললো, কিন্তু পড়া লাগলো না, ওর আগে থেকেই মুখস্থ আছে। শুধু বইয়ের পাতার দিকে তাকিয়ে থাকলো আর স্যারকে আড়চোখে দেখতে লাগলো। স্যার পত্রিকাটা মুখের সামনে মেলে রেখেছে, এমনভাবে যে লাবু স্যারের মুখ দেখতে পাচ্ছে না। স্যার বিড়বিড় করে কবিতা পড়তে লাগলো। লাবুর হাসি পেয়ে গেলো এবং হাসি সে চেপে রাখতে পারলো না, ফিক করে হেসে ফেললো। হেসে ফেলেই বুঝতে পারলো আরো একবার সে ধরা খেয়ে গেছে, আরো একবার তাকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।

রুবেল-সুরুজ-টিপুরা তো বটেই, অন্যরাও লাবুর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

স্যার পত্রিকার উপর দিয়ে অনেকটা উঁকি দেয়ার মতো করে তাকালো, বললো, ‘কে হাসলো?’

কারো সাড়া পাওয়া গেলো না। স্যার ধমকে উঠলো, ‘হাসলো কে?’

লাবু দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বললো, ‘আমি স্যার।’ রুবেল অবশ্য লাবুকে দাঁড়াতে বাধা দিচ্ছিল।

‘হাসলে কেন? এইখানে কি হাসির নাটক চলতিছে?’

‘না, স্যার, এমনিই হাসি এসে গেছে।’ লাবু মাথা নিচু করে মিনমিন করে বলে।
‘এমনিই এসে গেছে! হাসি কি এমনিই আসার জিনিস?’

‘ভুল হয়ে গেছে স্যার।’ লাবু মাথা নিচু করেই বলে।

স্যার লাবুকে ভালো করে লক্ষ্য করে বলে, ‘অ্যাই, মাথাটা তোলো তো দেখি।’

লাবু মাথা তুললো, স্যারের দিকে একবার সরাসরি তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো। স্যার বললো, ‘তুমি কে? তোমারে তো চিনতেছি না, নতুন ভর্তি হইছো নাকি?’
‘না স্যার। আসলে—’

লাবুকে থামিয়ে দিয়ে রুবেল দাঁড়িয়ে আগের ক্লাসের কথাটাই কপি করে দেয়, ‘স্যার, ওই আমার চাচাতো ভাই। শহরে থাকে। বেড়াইতে আসছে। এই কয়দিন এইখানে ক্লাস করবো। আব্বা হেডস্যাররে বইলা রাখছে।’

‘ও, আচ্ছা। রুবেলের চাচাতো ভাই? তার মানে রায়হানের ছেলে তুমি?’

‘জি, স্যার।’ লাবু জবাব দেয়।

‘নাম কী তোমার?’

‘লাবু। সাদিব রায়হান লাবু।’
‘বাহ, খুব ভালো নাম তো। তোমার আব্বু-আম্মুও কি এসেছে?’
‘আব্বু আসে নি স্যার, তিনদিন পর আসবে। আমি আম্মুর সাথে এসেছি।’
‘ও, আচ্ছা। তুমি কি জানো তোমার আব্বু আর আমি একসাথে পড়তাম?’

‘এইমাত্র জানলাম স্যার।’ লাবু এবার স্যারের সাথে একটু স্বাভাবিক হয়।
স্যার হা হা করে হাসে। হাসতে হাসতে বলে, ‘তুমি তো খুব সুন্দর করে কথা বলো। আসো, এখানে আসো, আমার পাশে।’

ক্লাসের কেউ কেউ লাবুর দিকে হিংসার দৃষ্টিতে তাকায়। অনেকেই হয়তো ভেবেছিল লাবুকে এখন শাস্তি হিসেবে জসীমউদ্দীনের পুরো কবিতা মুখস্থ বলতে হবে! লাবু পারবে না, ক্লাসের বাইরে নিলডাউন করে রাখা হবে তাকে। তারপর তারা লাবুকে দেখে মুচকি মুচকি হাসবে, সুযোগ বুঝে ক্ষেপাবে। কিন্তু লাবুর সাথে স্যারের কথা বলার ভাব দেখে তাদের আশার গুড়ে বালি পড়ে গেলো!

লাবু স্যারের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই তার পিঠে একটা থাবা দিয়ে পত্রিকা দেখিয়ে দিয়ে স্যার বললো, ‘নাও, এই কবিতাটা সুন্দর করে আবৃত্তি করো তো।’

কাউকে বলে দিতে হয় না, সবাই বুঝতে পারে স্যার লাবুকে তার লেখা কবিতাটা আবৃত্তি করতে বলছে।

লাবু তবু নিশ্চিত করার জন্য একটু আহ্লাদ করে বলে, ‘স্যার, এটা আপনার লেখা কবিতা?’

‘ওই আর কী।’ স্যার যেন একটু লজ্জা পেয়ে যায়।

লাবু কবিতাটা আবৃত্তি করতে লাগলো। স্যারসহ সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনলো। আবৃত্তি শেষ হলে স্যার লাবুর পিঠ চাপড়ে দেয়, ‘দারুণ আবৃত্তি করেছো। থ্যাঙ্ক ইউ। যাও বসো।’

এতক্ষণে নিজেকে এই ক্লাসের একজন বলে মনে হয় লাবুর। এতক্ষণ পর পর মনে হচ্ছিল। এবং লক্ষ্য করে সবাই আবার তার দিকে কেমন কেমন করে যেন তাকাচ্ছে। এবার অবশ্য লাবুর আর বিব্রত লাগে না।

ক্লাস শেষে যাবার আগে স্যার লাবুকে বললো, ‘তোমার আম্মুকে আমার সালাম দিও। আমি পরে একসময় দেখা করতে যাবো।’

‘ঠিক আছে স্যার।’ লাবু মাথা নেড়ে জবাব দেয়।

টিফিনের আগে আরো দুইটা ক্লাস হলো। তার একটা ইংরেজি। ইংরেজি স্যার আসলেই খুব রাগী। একটা প্যারাগ্রাফ লিখতে দিয়েছিল। অনেকেই ঠিকমতো লিখতে পারে নি, তাদের কী মারটাই না দিলো স্যার! লাবু দুইটা বানান ভুল করেছিল। তার দুই হাতে দুইটা করে বেত মেরেছে, লাল হয়ে দাগ পড়ে গেছে হাতে। লাবু চেনা নাকি অচেনা, নতুন নাকি পুরনো—এসবে স্যারের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। টিফিনের আগে শেষ ক্লাস ছিল সমাজ। খুব নিরীহ একটা স্যারের উত্তাপহীন একটা ক্লাস।

(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্বসমূহ:

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ১)

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ০২)

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ০৩)

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ০৪)

লেখক পরিচিতি
মুহসীন মোসাদ্দেক
জন্ম ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮; রাজশাহী, বাংলাদেশ। ২০১০ সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ঘন অন্ধকারের খোঁজে’ এবং ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘ঘি দেয়া গরম ভাত আর চিতল মাছের পেটি’। মাঝে ২০১৩ সালে কিশোর গল্পগ্রন্থ ‘মগডাল বাহাদুর’ প্রকাশিত হয়। প্রাণিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্নের পর এমবিএ করেন ব্যবস্থাপনা শিক্ষায়। বর্তমানে স্বনামধন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করছেন। বই প্রকাশে দীর্ঘ বিরতি চললেও লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত। শিশু-কিশোরদের জন্য লিখতে ভালোবাসেন, বিশেষ করে দুরন্তপনার গল্পগুলো। লেখকের কৈশোর জীবন তুমুল দুরন্তপনায় কেটেছে এমনটা নয়, তবু বেশ রঙিন এক কৈশোর কাটিয়েছেন মফস্বল শহরে। রঙিন সে জীবনে ফিরে যাবার সুযোগ না থাকায় খুব আফসোস হয়। এ আফসোস ঘোচাতেই লেখার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে যান কৈশোরে আর দুরন্তপনায় মেতে ওঠেন ইচ্ছেমতো। প্রত্যাশা কেবল এতটুকুই, কিছু উপযুক্ত পাঠক সঙ্গী হোক তার লেখার এ দুরন্ত জীবনে।

2 Comments

Leave a Reply

error: Content is protected !!
WordPress Workshop Edutech – Education WordPress Theme Eduti – Education Elementor Template Kit Eduvision – Online Course Multipurpose Education WordPress Theme Effective Lottie Animation Addon For Elementor Effigy – A Clean and Professional Music WordPress Theme eFlorist – Flower Boutique & Decoration Elementor Template Kit eForm easySubmission – Direct Form Edit & Extended Format String eForm – WordPress Form Builder Efpose – Multipurpose Blog and Newspaper Theme Efuel – Electric Car Rental & EV Charging WordPress Theme