গল্পফিচার নিউজশিল্প-সাহিত্য

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ১০)

মুহসীন মোসাদ্দেক

 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

একটু পরেই নাস্তা খাওয়ার ডাক আসে। নাস্তা খেতে বসেও লাবু-রুবেলের মুখ আতঙ্কিত দেখা যায়। মুচকি মুচকি হাসতে দেখা যায় আম্মুকেও। জুয়েল ভাই নাস্তা খেতে আসে না। হারুন ভাই তার ঘরে নাস্তা দিয়ে আসে। বিষয়টা তাই আর উপস্থাপিত হয় না। নাস্তা সেরে লাবু-রুবেল স্কুলে রওনা হয়।

আমবাগানে সবাই একসাথে হয়। তারপর একসাথে স্কুলে যেতে থাকে। অবশ্য টিপুকে কিছুটা দলছুট বলা যায়। সে যথারীতি ফড়িংয়ের পিছে ছুটতে থাকে। দুই-একটা ধরে, কিন্তু তার সাইজ মনঃপূত হয় না! বেশ বড় সাইজের একটাকে অবশ্য ধরেই ফেলেছিল, যেই না ধরেছে ঠিক তখনই ঝোপের মধ্যে থেকে একটা সাপ বেরিয়ে আসে। ভয়ে লাফিয়ে পিছে সরে যায় টিপু আর হাত থেকে ফসকে যায় ফড়িংটা। প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও পরে সাপটাকে মারতে উৎসাহী হয়ে ওঠে সবাই। হাতের কাছে যে যা পায়—কেউ লাঠি, কেউ ঢিল কিংবা বড়সড়ো ইট নিয়ে সাপের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে তৈরি হয়ে যায়। ইলিয়াস কিছু না পেয়ে তার পায়ের চামড়ার সেন্ডেল হাতে নিয়ে তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু সাপটা এতগুলো দস্যি ছেলের সাথে একলা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে উৎসাহ দেখায় না! বিপদ বুঝতে পেরে সে আরেকটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়ে। সে আর তার টিক্কিও দেখায় না! লাবুরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। সাপটার বেরিয়ে আসার কোনো লক্ষণ না দেখে তারাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।

টিপু বলে, ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হয় শুনছিলাম, কিন্তু ফড়িং ধরতে সাপ বের হয় এইটা তো শুনি নাই!’

টিপুর কৌতুকে কেউ বিনোদন পায় না। টিপু তাই একলা একলাই হাসে।
সাপের বিষয়টা সবার ভেতরে উৎসাহ তৈরি করলেও শেফালির ভেতরে মোটেও তা করলো না। সে বরং ভয়ে কয়েক হাত দূরে পিছিয়ে গিয়েছিল। সাপটাকে আর দেখা না গেলেও তার ভয় যায় না। বেশ সতর্ক পায়ে সে হাঁটে এবং একটু পর পরই এদিক-ওদিক খেয়াল করে। তার অবস্থা দেখে মনে হয়, যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো দিক থেকে একটা সাপ বেরিয়ে আসা যেন এখানে নিয়মিত ঘটনা!

সাপ বিষয়ক উত্তেজনা কমে যেতে রুবেল বললো, ‘ছোট আম্মা কিন্তু বিষয়টা ধইরা ফেলছে!’

‘হুম।’ লাবু গম্ভীর হয়ে বলে।
‘কী ধইরা ফেলছে?’ সুরুজ বলে।
‘জুয়েল ভাইরে ভয় দেখানোর ঘটনাটা যে আমরাই ঘটাইছি সেইটা।’

‘ও।’ সুরুজের কাছে বিষয়টা যেন স্বাভাবিক লাগে।

‘তারপর কিছু কয় নাই?’ মিন্টু কিছুটা আতঙ্কিত ভাব করে বলে।

‘নাহ, কিছু কয় নাই। ছোট আম্মা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে নাই। ছোট আম্মাও বিষয়টা আর ঘাঁটাইলো না। ক্যান বুঝলাম না!’

‘এখন কিছু বলে নি। কিন্তু অন্য কোনো দিক দিয়ে নিশ্চয় এর জের টানবে।’ লাবু গম্ভীর হয়েই বলে।

শেফালি বলে, ‘তার মানে আমরা কাজটা নিখুঁতভাবে করতে পারি নাই।’

‘নিখুঁতভাবে করার কিছু নাই—’ সুরুজ সরলভাবে ব্যাখ্যা করে, ‘এইরকম একটা কাজ যে আমাগো পক্ষে করা সম্ভব এইটা সবাই জানে। তার ওপর এতদিন এইরকম কিছু ঘটে নাই, লাবু এইখানে আইতেই সেইটা ঘটলো। আমি তো ভাবছিলাম বাড়িতে যাইয়া একটু ভাবতেই জুয়েল ভাই বিষয়টা বুঝতে পারবো। তারপর আমাগো প্যাঁদানি খাইতে হইবো! ভয় পাইয়া সে যে জ্বরে পড়বো, এইটা আমি ভাবি নাই। জুয়েল ভাই একটু বেশিই ভয়কাতুরে বইলা হয়তো বিষয়টা সত্য মনে করছে। এবং আইজ শুধু ছোট চাচি বুঝতে পারছে, দুইদিন পর জুয়েল ভাইও বুঝতে পারবো। মাঝখান দিয়া জুয়েল ভাইরে ভয় দেখানো গেছে এইটাই বিরাট ব্যাপার।’
সুরুজের ব্যাখ্যার পর কারো আর কোনো কথা থাকে না।

ক্লাসে এসে গতকালের মতো তিন নম্বর বেঞ্চেই ব্যাগ রাখে সবাই। এই বেঞ্চটা ওদের জন্য মোটামুটি নির্ধারিত। অন্য কেউ এ বেঞ্চে এসে সহজে বসে না। বেঞ্চের ধারে বসা নিয়ে ঝামেলা পাকে না। লাবুই বসে ধারে। শেফালিও মেয়েদের দিকের তিন নম্বর বেঞ্চে বসে। কিন্তু সে ধারে বসে না, একজনের পরে বসে। আজান স্যারের খামচি খাওয়ার কোনো আগ্রহ তার নেই।

অ্যাসেম্বলির আগে এখনো আধা ঘণ্টার মতো সময় আছে। মিন্টু প্রস্তাব দেয় এই সময় একটু ত্রিকেট খেলা যেতে পারে। প্রস্তাব সাদরে গৃহীত হয়। ক্লাসরুমে একটা আলমারি আছে। আলমারির পেছনে ব্যাট-বল আর স্ট্যাম্প রাখা থাকে। প্রায় দিনই তারা ক্রিকেট খেলে। বাসা থেকে বারবার আনা-নেয়ার ঝামেলা এড়াতে আলমারির পেছনে একসেট ব্যাট-বল আর স্ট্যাম্প রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সুরুজ ব্যাট-বল আর স্ট্যাম্প বের করে। স্কুলের সামনে যে বিশাল মাঠ সেখানে সব ক্লাসের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন রকম খেলা খেলে। রুবেলদের খেলার জন্য মাঠের একপাশে একটা জায়গা নির্দিষ্ট করা আছে। ওরা সবসময় সেখানেই খেলে। ব্যাট-বল নিয়ে বের হয়ে দেখে কারা যেন জায়গাটা দখল করে নিয়েছে। গত কয়েকদিন তাদের ক্রিকেট খেলা হয় নি। এই সুযোগে জায়গা হাতছাড়া হয়ে গেছে। কিন্তু ওরা ছেড়ে দিতে চায় না।

কাছে গিয়ে দেখে ক্লাস এইটের কয়েকজন ছেলে সেখানে ক্রিকেট খেলছে। রুবেল ভদ্রভাবেই বলে, ‘তোমরা এইখানে কেন ভাইয়া? এইখানে তো আমরা খেলি।’
মোটাসোটা একটা ছেলে বেশ রাগ রাগ ভাব করে বলে, ‘তাই কী হইছে?’

‘আমরা এখন এইখানে খেলবো। তোমরা অন্য কোথাও গিয়া খেলো।’ রুবেল শান্তভাবেই বলে।

‘জায়গাটা কী তোরা কিন্না রাখছোস! কইলি আর আমরা অন্য জায়গায় চইলা গেলাম!’ মোটাসোটা ছেলেটা উড়িয়ে দেয়ার মতো ভঙ্গি করে বলে, ‘তোরা অন্য জায়গায় গিয়া খেল।’

সুরুজ এগিয়ে গিয়ে বলে, ‘এইখানে সবসময় আমরা খেলি। আমরাই এইখানে খেলবো, তোমরাই অন্য জায়গায় গিয়া খেলো।’

‘সবসময় খেলোস বইলা যে এখনো খেলা লাগবো এইটা কে কইছে!’ মোটাসোটা ছেলেটা তাচ্ছিল্য করে বলে, ‘অন্য কোথাও খেলতে পারলে খেল, নাইলে বইসা বইসা আঙ্গুল চোষ। এইখানে প্যান প্যান করিস না। যা ভাগ!’

‘ওই মিয়া, বুইঝা শুইনা কথা কও—’ সুরুজ আঙুল উঁচিয়ে বলে, ‘ভালো হইবো না কিন্তু—’

মোটাসোটা ছেলেটা তেড়ে আসে, ‘ওই, কী করবি তুই? কী করবি, অ্যাঁ?’ বলতে বলতেই সুরুজকে ধাক্কা দেয়। সুরুজ উল্টে পড়ে।

লাবুরা সবাই এগিয়ে যায়। ওদিকে ওরা সবাইও এগিয়ে আসে। সুরুজ উঠেই মোটাসোটা ছেলেটাকে তেড়ে যেতে চায়, ইলিয়াস আর মিন্টু তাকে আটকায়। মোটাসোটা ছেলেটাও পাল্টা তেড়ে আসে, তাকে তার দলের ছেলেরা আটকায়।
সুরুজ চেঁচিয়ে বলে, ‘কত্ত বড় সাহস, আমারে ধাক্কা দেয়! ওরে আইজ শ্যাষ কইরা ফ্যালাবো!’

মোটসোটা ছেলেটাও পাল্টা জবাব দেয়, ‘আয়, আয়! দেখি তুই কত্ত বাহাদুর!’
কিন্তু কেউ আর এগোতে পারে না। দুজনকেই আটকে রাখা হয়।

‘আচ্ছা, এসব কী হচ্ছে।’ লাবু মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করে, ‘মারামারি করে তো কোনো সমাধান হবে না। আমাদের অন্য কোনো উপায়ে সমাধান করতে হবে।’
লাবুকে দেখে এবং লাবুর কথা শুনে অপর দলের ছেলেরা একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। মোটাসোটা ছেলেটা বলে, ‘এইটা আবার কই থেইকা আইছে!’

লাবু পাত্তা দেয় না।

সুরুজ চেঁচিয়ে বলে, ‘সমাধানের কিছু নাই। এইখানে আমরা সবসময় খেলি, আমরাই এখানে খেলবো।’

‘এহ, কোথাকার মিনিস্টার চইলা আসছে! এইখানে খেলে, তাই জনমভর এইখানেই খেলবো!’

সুরুজ পাল্টা জবাব দেয়ার সুযোগ পেলো না, অপর দল থেকে লম্বা করে একজন বললো, ‘আহা, তোরা আর ঝগড়া করিস না তো! দুইজনই চুপ থাক। ছেলেটা কী কয় সেইটা আগে শুনি।’ লাবুকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘তুমি কও কী কইতেছিলা।’
‘এক জায়গায় তো দুইদল খেলতে পারবে না। এখানে একদলকে থাকতে হবে আর একদলকে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। এখন, কারা থাকবে আর কারা ছেড়ে দিবে সেইটা নির্ধারণের জন্য একটা উপায় বের করতে হবে।’

‘হুম, তাইলে কী করা যায়।’ ভাবতে থাকে লম্বা ছেলেটা।

টিপু বলে, ‘টস করা যাইতে পারে।’
লম্বা ছেলেটা বলে, ‘টস তো একটা মামুলি ব্যাপার হইয়া গেলো। এর চেয়ে ভালো কোনো উপায় বাহির করা দরকার।’

সুরুজকে ছেড়ে দিয়ে ইলিয়াস ফট করে বলে, ‘একটা ম্যাচ খেলা যাইতে পারে। অগো দলের সাথে আমাগো দলের ম্যাচ। যারা জিতবো তারা এইখানে খেলবো আর যারা হারবো তারা অন্য কোথাও গিয়া খেলতে পারলে খেলবো, নাইলে বইসা বইসা আঙ্গুল চুষবো।’

‘হুম, এইটা একটা ভালো বুদ্ধি।’ লম্বা ছেলেটা মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলে।
লাবুও বলে, ‘হ্যাঁ, এইটা একটা ভালো সমাধান হবে। তাহলে আজ বিকেলে স্কুল ছুটির পর এই স্কুল মাঠেই তোমাদের সাথে আমাদের ম্যাচ হবে। কী বলো তোমরা?’
ওই দল থেকে অন্য একটা ছেলে বলে, ‘হুম, আমরা রাজি।’

‘যাহ, যাহ। তোরা যে কত পারোস দেখা আছে।’ মোটাসোটা ছেলেটা তাচ্ছিল্য করে বলে।

লাবু গম্ভীর গলায় জবাব দেয়, ‘হুম, বিকেলেই দেখা যাবে।’

(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্বসমূহ:

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ১)

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ০২)

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ০৩)

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ০৪)

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ০৫)

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ০৬)

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ০৭)

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ০৮)

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস: লাবুদের দস্যিপনা (পর্ব ০৯)

লেখক পরিচিতি
মুহসীন মোসাদ্দেক
জন্ম ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮; রাজশাহী, বাংলাদেশ। ২০১০ সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ঘন অন্ধকারের খোঁজে’ এবং ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘ঘি দেয়া গরম ভাত আর চিতল মাছের পেটি’। মাঝে ২০১৩ সালে কিশোর গল্পগ্রন্থ ‘মগডাল বাহাদুর’ প্রকাশিত হয়। প্রাণিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্নের পর এমবিএ করেন ব্যবস্থাপনা শিক্ষায়। বর্তমানে স্বনামধন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করছেন। বই প্রকাশে দীর্ঘ বিরতি চললেও লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত। শিশু-কিশোরদের জন্য লিখতে ভালোবাসেন, বিশেষ করে দুরন্তপনার গল্পগুলো। লেখকের কৈশোর জীবন তুমুল দুরন্তপনায় কেটেছে এমনটা নয়, তবু বেশ রঙিন এক কৈশোর কাটিয়েছেন মফস্বল শহরে। রঙিন সে জীবনে ফিরে যাবার সুযোগ না থাকায় খুব আফসোস হয়। এ আফসোস ঘোচাতেই লেখার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে যান কৈশোরে আর দুরন্তপনায় মেতে ওঠেন ইচ্ছেমতো। প্রত্যাশা কেবল এতটুকুই, কিছু উপযুক্ত পাঠক সঙ্গী হোক তার লেখার এ দুরন্ত জীবনে।

1 Comment

Leave a Reply

error: Content is protected !!